প্রকাশ: ০৯ আগস্ট, ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসির জীবনে নেমে এসেছে গভীর শোক। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর তাঁর বাবা হোর্হে মেসি মারা গেছেন বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। বাবার মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজ শহর আর্জেন্টিনার রোজারিওতে ছুটে গেছেন বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে এবং বাবাকে শেষ বিদায় জানাতেই তাঁর এই সফর।
স্থানীয় সময় শুক্রবার গভীর রাত থেকে শনিবারের মধ্যবর্তী সময়ে, রাত প্রায় ২টার দিকে হোর্হে মেসির মৃত্যু হয় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে তাঁর মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে পরিবার কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। জানা গেছে, ৬৮ বছর বয়সী হোর্হে মেসি দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছিলেন এবং বেশ কিছু সময় ধরেই চিকিৎসাধীন ছিলেন।
বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়েও তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতির খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। তখন থেকেই ফুটবলভক্তদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। অবশেষে সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ফোর্ট লডারডেল থেকে ব্যক্তিগত বিমানে রওনা হয়ে শনিবার স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৪০ মিনিটে রোজারিও বিমানবন্দরে পৌঁছান লিওনেল মেসি। বিমানবন্দর থেকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে একটি ভ্যানে করে তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শহরের উদ্দেশে রওনা হন।
মেসির সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো এবং তাঁদের তিন সন্তান। পারিবারিক এই শোকের সময়ে পরিবারের সবাই একসঙ্গে উপস্থিত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, রোজারিওর পাশের শহর পেরেজে পারিবারিক কবরস্থানে হোর্হে মেসিকে সমাহিত করা হবে।
আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টস জানিয়েছে, শেষ বিদায়ের পুরো আয়োজন রাখা হয়েছে একান্ত পারিবারিক পরিবেশে। সেখানে শুধুমাত্র পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং দীর্ঘদিনের পরিচিত কয়েকজন বন্ধু উপস্থিত থাকবেন। সংবাদমাধ্যম কিংবা সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত রাখা হয়েছে পরিবারের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে।
তবে শেষকৃত্য ব্যক্তিগত পরিসরে হলেও মেসির প্রতি সমর্থন জানাতে হাজারো ভক্ত কবরস্থানের বাইরে জড়ো হয়েছেন। তাঁদের অনেকের হাতে ছিল ফুল, আর্জেন্টিনার পতাকা এবং মেসির জার্সি। কেউ কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেছেন, আবার অনেকে পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের কাছে মেসি যেমন একজন ফুটবল কিংবদন্তি, তেমনি তাঁর এই ব্যক্তিগত শোকও অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
লিওনেল মেসির ফুটবল জীবনের শুরু থেকে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পাশে ছিলেন তাঁর বাবা হোর্হে মেসি। শৈশবে ছেলের প্রতিভা চিনতে পেরে তিনি নিয়মিত প্রশিক্ষণে নিয়ে যেতেন। পরবর্তীতে বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার সময়ও পরিবারের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন তিনিই। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি মেসির প্রতিনিধি এবং এজেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
মেসির ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, ক্লাব পরিবর্তন, চুক্তি নবায়ন এবং বিভিন্ন পেশাদার আলোচনায় হোর্হে মেসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ফুটবল বিশ্বের অনেকেই মনে করেন, মেসির সাফল্যের নেপথ্যে পরিবারের যে অবদান রয়েছে, তার অন্যতম বড় অংশ ছিল তাঁর বাবার নিরলস সমর্থন ও ত্যাগ।
এই পারিবারিক শোকের কারণে ইন্টার মায়ামির হয়ে লিগস কাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে খেলতে পারেননি মেসি। ক্লাব কর্তৃপক্ষ তাঁর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনায় তাঁকে ছুটি দেয়। বাবার শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি আর্জেন্টিনায় যাওয়ায় মন্টেরির বিপক্ষে ম্যাচের দলেও ছিলেন না।
ম্যাচ শুরুর আগে ইন্টার মায়ামি এবং মন্টেরির খেলোয়াড়রা এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। গ্যালারিতে উপস্থিত সমর্থকেরাও “ফোর্সা, লিও” বা “শক্ত থাকো, লিও” লেখা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে মেসির প্রতি সংহতি জানান। পুরো স্টেডিয়ামে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
ম্যাচ চলাকালে ইন্টার মায়ামির হয়ে প্রথম গোল করেন আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার রদ্রিগো ডি পল। গোল করার পর তিনি নিজের জার্সি খুলে ভেতরে পরা লিওনেল মেসির ১০ নম্বর জার্সি প্রদর্শন করেন। এরপর আকাশের দিকে তাকিয়ে দুই হাত উঁচু করে বন্ধুর প্রতি সমর্থন জানান। পরে গণমাধ্যমে ডি পল বলেন, এই গোল তিনি শুধু অধিনায়ক মেসিকেই নয়, শোকাহত একজন বন্ধুকেও উৎসর্গ করেছেন।
তবে আবেগঘন এই ম্যাচে শেষ পর্যন্ত জয় পায়নি ইন্টার মায়ামি। লিগস কাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে তারা ২-১ ব্যবধানে মন্টেরির কাছে হেরে যায়। তবুও ম্যাচের ফলের চেয়ে দিনটির সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল মেসির পারিবারিক শোক এবং তাঁর প্রতি ফুটবল বিশ্বের সহমর্মিতা।
হোর্হে মেসির মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর বিশ্বের বিভিন্ন ক্লাব, ফুটবলার এবং ক্রীড়া সংগঠন শোক প্রকাশ করেছে। বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ, রোজারিও সেন্ট্রালসহ বিভিন্ন ক্লাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমবেদনা জানিয়েছে। অনেক বর্তমান ও সাবেক ফুটবলারও মেসি ও তাঁর পরিবারের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন।
ফুটবলের ঝলমলে আলোয় সবসময় আড়ালে থাকলেও হোর্হে মেসি ছিলেন ছেলের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। একজন অভিভাবক, পরামর্শদাতা এবং প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর ভূমিকা বিশ্ব ফুটবলে সুপরিচিত। তাঁর মৃত্যু শুধু মেসি পরিবারের জন্য নয়, বিশ্ব ফুটবলের জন্যও একটি আবেগঘন মুহূর্ত হয়ে থাকবে।
আগামী কয়েকদিন মেসি পরিবারের সঙ্গেই সময় কাটাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি কবে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরবেন এবং ইন্টার মায়ামির হয়ে আবার মাঠে নামবেন, সে বিষয়ে এখনো ক্লাবের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। আপাতত ফুটবল বিশ্ব অপেক্ষা করছে—কঠিন এই সময় পেরিয়ে কবে আবার মাঠে ফিরবেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক।