প্রকাশ: ০৯ আগস্ট, ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং সরবরাহ সংকটের কারণে কয়েক সপ্তাহ ধরে অস্বাভাবিক উচ্চ দামে বিক্রি হওয়া কাঁচা মরিচের বাজারে অবশেষে স্বস্তির আভাস মিলতে শুরু করেছে। ভারত থেকে পুনরায় কাঁচা মরিচ আমদানি শুরু হওয়ার পর পাইকারি বাজারে দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানির পরিমাণ বাড়তে থাকায় সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে। এর ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে সীমান্তবর্তী পাইকারি বাজারে দেখা গেলেও আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দেশের খুচরা বাজারেও এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
হিলি স্থলবন্দর সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সাড়ে আট মাস বন্ধ থাকার পর গত ৩ আগস্ট ভারত থেকে আবারও কাঁচা মরিচ আমদানি শুরু হয়। প্রথম দিন চারটি ট্রাকে মোট ২৯ টন ৪৪০ কেজি কাঁচা মরিচ দেশে প্রবেশ করে। পরদিন ৪ আগস্ট ১২টি ট্রাকে আসে ৭৫ টন ৫২০ কেজি কাঁচা মরিচ। এরপর ৬ আগস্ট আরও আটটি ট্রাকে ৬২ টন ৬৮০ কেজি কাঁচা মরিচ হিলি স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। কয়েক দিনের ব্যবধানে আমদানির এই ধারাবাহিকতা বাজারে সরবরাহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আমদানি শুরু হওয়ার আগে দেশের বিভিন্ন খুচরা বাজারে কাঁচা মরিচের দাম কেজিপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় পৌঁছে যায়। এতে সাধারণ ভোক্তাদের পাশাপাশি হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত শিল্পের উদ্যোক্তারাও বিপাকে পড়েন। প্রতিদিনের রান্নায় ব্যবহৃত একটি অপরিহার্য পণ্যের এমন মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
তবে ভারত থেকে নতুন চালান আসার পর পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। হিলি স্থলবন্দরের পাইকারি বাজারে প্রথমদিকে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ১৬০ টাকায় বিক্রি হলেও সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমতে থাকে। বর্তমানে সাধারণ মানের কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ৮০ টাকায় এবং উন্নত মানের কাঁচা মরিচ ৯০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কয়েক দিনের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
ঢাকার পাইকারি ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক জানান, দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে কয়েক সপ্তাহ ধরে বাজারে চরম সংকট ছিল। সে সময় উচ্চমূল্যে মরিচ কিনে দেশের বিভিন্ন মোকামে পাঠাতে হয়েছে। এখন ভারত থেকে নিয়মিত আমদানি শুরু হওয়ায় পাইকারি বাজারে দাম দ্রুত কমেছে। তাঁর মতে, সরবরাহ অব্যাহত থাকলে খুচরা বাজারেও ভোক্তারা কম দামে কাঁচা মরিচ কিনতে পারবেন।
হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক নাহিদ হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক বৈরী আবহাওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাঁচা মরিচের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং ক্ষেতের ক্ষতির কারণে বাজারে পর্যাপ্ত মরিচ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। পরে সরকার ভারত থেকে আমদানির অনুমতি দিলে বাজারে নতুন করে সরবরাহ বাড়তে শুরু করে এবং দাম দ্রুত কমে আসে।
উদ্ভিদ সংগনিরোধ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, বাজারে মূল্য অস্থিতিশীল হয়ে পড়ায় সরকার আমদানির অনুমতি দেয়। হিলি স্থলবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, গত বছরের ২০ নভেম্বরের পর দীর্ঘ সময় এই বন্দর দিয়ে ভারত থেকে কাঁচা মরিচ আমদানি বন্ধ ছিল। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় পুনরায় আমদানির অনুমতি দেওয়ার পর সরবরাহ বাড়ছে এবং বাজার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষিপণ্যের বাজারে সরবরাহ কমে গেলে মূল্য দ্রুত বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সীমিত সময়ের জন্য আমদানির অনুমতি দিলে বাজারে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে শুধু আমদানির ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং কৃষকদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি নিশ্চিত করাও জরুরি।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টি, অতিবৃষ্টি এবং তাপমাত্রার পরিবর্তন এখন সবজি ও মসলাজাতীয় ফসলের উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলছে। ফলে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহনশীল জাতের উন্নয়ন, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং কৃষকদের জন্য সময়োপযোগী সহায়তা প্রয়োজন।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, পাইকারি বাজারে দাম কমলেও অনেক সময় সেই সুবিধা দ্রুত খুচরা পর্যায়ে পৌঁছায় না। তাই বাজার তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ভোক্তাদের অতিরিক্ত মূল্য গুনতে না হয়। একই সঙ্গে নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ করলে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধিও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
হিলি স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ আশাবাদী, ভারত থেকে কাঁচা মরিচ আমদানির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দেশের বিভিন্ন খুচরা বাজারেও দামের আরও ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাবে। এতে সাধারণ ভোক্তারা যেমন স্বস্তি পাবেন, তেমনি ব্যবসায়ীরাও স্থিতিশীল বাজারে স্বাভাবিকভাবে বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষিপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে স্থানীয় উৎপাদন ও প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে কাঁচা মরিচের বাজারে যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা অব্যাহত রাখতে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং বাজার তদারকির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিকল্প নেই।