রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে ১১ পেরুভিয়ান নিহত, নিখোঁজ ১১৪

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনীর হয়ে অংশ নেওয়া পেরুর নাগরিকদের নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে। পেরুর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৪৫৯ জন পেরুভিয়ান নাগরিক রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন বলে সরকারি তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ১১ জন নিহত, ১১৪ জন নিখোঁজ এবং তিনজন ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে বন্দি হয়েছেন। একই সঙ্গে কয়েক ডজন নাগরিককে রাশিয়া থেকে সরিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে।

রোববার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে পেরুর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মোট ৩১ জন পেরুভিয়ান নাগরিককে রাশিয়া থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৮ জন ইতোমধ্যে পেরুতে ফিরে গেছেন এবং তিনজন ইউরোপে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে আরও কয়েকজনকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব নাগরিকের কয়েকজন নিজেদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে খুঁজে পাওয়ার পর কনস্যুলার সহায়তা চেয়েছিলেন।

পেরু সরকারের প্রকাশ করা এই পরিসংখ্যান যুদ্ধক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ ১১৪ জনের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তারা কোথায় আছেন এবং তাদের মধ্যে কতজন জীবিত—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন স্বজনেরা। যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করা কূটনৈতিক ও মানবিক উভয় দিক থেকেই জটিল হয়ে উঠেছে।

পেরুর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাশিয়ায় থাকা আরও দুই পেরুভিয়ান নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে মস্কোয় অবস্থিত পেরুর দূতাবাসের কনস্যুলার বিভাগ কাজ করছে। এর আগে জুলাইয়ের শেষ দিকেও দুই পেরুভিয়ানকে সহায়তা দেওয়া হয় এবং তারা দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে অবস্থান করছেন। এসব প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় পেরুর সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোও যুক্ত রয়েছে।

তবে এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো রাশিয়ায় যাওয়ার ক্ষেত্রে ভুয়া চাকরির প্রস্তাব ব্যবহারের অভিযোগ। পেরুর সরকার নাগরিকদের সতর্ক করে বলেছে, বিদেশে চাকরির আকর্ষণীয় প্রস্তাবের আড়ালে মানবপাচারকারী চক্র সক্রিয় থাকতে পারে। বিশেষ করে নিরাপত্তাকর্মী বা অন্য কোনো বেসামরিক চাকরির কথা বলে কাউকে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সামরিক কার্যক্রমে যুক্ত করার অভিযোগ ইতোমধ্যে তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে।

পেরুর সরকারি কৌঁসুলির কার্যালয় মে মাসে জানিয়েছিল, দেশটির কয়েকজন নাগরিককে রাশিয়ায় নিরাপত্তাকর্মী ও অন্যান্য চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে নেওয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে মানবপাচারের সম্ভাব্য ঘটনা তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের যুদ্ধ-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছিল।

এই অভিযোগের কারণে বিষয়টি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে বিদেশি যোদ্ধা নিয়োগের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি মানবপাচার, প্রতারণা এবং শ্রম-শোষণের সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের বিষয়েও পরিণত হয়েছে। পেরুর বিচার মন্ত্রণালয়ও মে মাসে জানিয়েছিল, ভুয়া চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ করা ৩৭টি পরিবারের সদস্যদের আইনি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় উচ্চ বেতন ও বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

পেরুর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, বিদেশি কোনো দেশের সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দিতে হলে দেশটির আইনি কাঠামো অনুযায়ী সরকারের পূর্বানুমতি প্রয়োজন। এ বিষয়ে মস্কোয় রুশ কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গেও পেরু সরকার যোগাযোগ করেছে। এপ্রিল মাসে পেরুর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রুশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাছে নাগরিকদের একটি তালিকা দিয়ে তাদের অবস্থান, শারীরিক অবস্থা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে তথ্য চেয়েছিল। একই সঙ্গে রাশিয়ায় নিযুক্ত পেরুর রাষ্ট্রদূতকে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

যুদ্ধক্ষেত্রে নিখোঁজ নাগরিকদের সন্ধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথও খোলা হচ্ছে। পেরু সরকার নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্ত ও অবস্থান নির্ধারণে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির সহায়তা চেয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ, পরিচয় নিশ্চিত করা এবং পরিবারগুলোর কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া একটি কঠিন মানবিক কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে পেরুর স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়া স্বজনদের দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে তাদের পরিবারের সদস্যরা লিমায় রুশ দূতাবাসের সামনে জড়ো হয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা বিশেষ করে আহত বা নিখোঁজ স্বজনদের অবস্থান সম্পর্কে দ্রুত তথ্য প্রকাশ এবং তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের কাছে সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় উদ্বেগ হলো—যারা এখনো নিখোঁজ, তাদের সঙ্গে কী ঘটেছে।

পরিবারগুলোর একজন মুখপাত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আরও বড় সংখ্যক মৃত্যুর দাবি সামনে এসেছে। অন্তত ১৫০ জন পেরুভিয়ান নিহত হয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও পেরু সরকার এখন পর্যন্ত সেই সংখ্যা নিশ্চিত করেনি। ফলে সরকারি হিসাবে ১১ জন নিহতের তথ্যই বর্তমানে যাচাইযোগ্য সংখ্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পার্থক্যটি যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহের জটিলতা এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে অনিশ্চয়তার দিকটিও তুলে ধরে।

পেরু সরকার নাগরিকদের প্রতি বিশেষভাবে আহ্বান জানিয়েছে, রাশিয়া বা যুদ্ধসংক্রান্ত কোনো বিদেশি চাকরির প্রস্তাব গ্রহণের আগে তার সত্যতা যাচাই করতে। মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের বিষয়ে তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি কর্তৃপক্ষকে জানাতেও বলা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য মস্কো ও ইউরোপের সংশ্লিষ্ট কনস্যুলার চ্যানেলগুলো ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের রুশ বাহিনীতে নিয়োগের বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রমেই বেশি আলোচিত হচ্ছে। পেরুর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতি কখনো কখনো মানুষকে এমন এক বাস্তবতায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে চাকরির বদলে যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা এবং প্রাণহানির মুখোমুখি হতে হয়।

পেরুর জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিখোঁজ ১১৪ নাগরিকের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া, বন্দিদের বিষয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং যাদের জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব, তাদের নিরাপদে দেশে ফেরানো। পাশাপাশি ভুয়া চাকরির মাধ্যমে নাগরিকদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগের তদন্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সরকারি পরিসংখ্যানের ১১টি মৃত্যু তাই কেবল একটি সংখ্যা নয়। এর পেছনে রয়েছে ১১টি পরিবার, যাদের জন্য যুদ্ধের হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের গোলাগুলির শব্দ এখন ব্যক্তিগত শোকের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। আর নিখোঁজ ১১৪ জনের পরিবার এখন অপেক্ষা করছে একটি নিশ্চিত খবরের জন্য—তাদের স্বজনেরা কোথায়, কী অবস্থায় আছেন এবং আদৌ তারা ঘরে ফিরতে পারবেন কি না।

এই পরিস্থিতিতে পেরু সরকারের কূটনৈতিক ও কনস্যুলার তৎপরতার পাশাপাশি মানবপাচারের অভিযোগের তদন্ত এবং বিদেশে চাকরির নামে নাগরিকদের প্রতারণার ঝুঁকি মোকাবিলাই সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত