হরমুজ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ফের বাড়ল তেলের দাম

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা কাটেনি। ইরান ও ওমানের মধ্যে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নতুন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা এগোলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ পুরোপুরি খুলবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। এই অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে এশিয়ার বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবারও বেড়েছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা ৫৬ মিনিট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারের প্রধান সূচক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৯১ সেন্ট বা ১ দশমিক ০৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৪ দশমিক ৪৬ ডলারে উঠেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ৬১ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ দশমিক ৭৯ ডলারে দাঁড়ায়।

তেলের বাজারে এই ঊর্ধ্বগতি মূলত হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি নতুন অনিশ্চয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত। এর আগে গত সপ্তাহে ইরান ও ওমানের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাজারে আশাবাদ দেখা দিয়েছিল। তখন ধারণা করা হয়েছিল, নতুন একটি নৌপথ ব্যবস্থার বিষয়ে দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছালে হরমুজ দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে। সেই প্রত্যাশায় ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই—দুই ধরনের তেলের দামই এক সপ্তাহে ৭ শতাংশের বেশি কমে যায়।

কিন্তু সপ্তাহের শুরুতেই সেই আশাবাদ কিছুটা ফিকে হয়েছে। ইরান জানিয়েছে, ওমানের সঙ্গে নতুন নৌপথ নির্ধারণের বিষয়ে সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। ফলে আলোচনায় অগ্রগতি থাকলেও হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট নিশ্চয়তা নেই।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব এখানেই যে, এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি গবেষণা প্রতিবেদনের হিসাবে, বৈশ্বিক পেট্রোলিয়াম সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাণিজ্য হওয়া তেলের প্রায় ২৭ শতাংশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।

তাই হরমুজে সামান্য সময়ের জন্যও জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের শোধনাগার, জ্বালানি আমদানিকারক এবং পরিবহন খাতকে তখন বিকল্প উৎস ও সরবরাহপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা বাড়লে বাজারে ভবিষ্যৎ মূল্য নিয়ে জল্পনা বাড়ে এবং তার প্রতিফলন পড়ে অপরিশোধিত তেলের দামে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আশঙ্কাই আবার সামনে এসেছে। ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনার অগ্রগতি হলেও তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কয়েকটি বিষয়ে ছাড় প্রয়োজন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব দাবির মধ্যে অতীতের হামলায় ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে হুমকি ও সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের মতো বিষয় রয়েছে। ইরানের হিমায়িত সম্পদ ছাড়ের দাবিও আলোচনার অংশ হিসেবে উঠে এসেছে।

ফলে হরমুজ ইস্যুটি এখন শুধু একটি নৌপথ পুনরায় চালুর প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা আলোচনার ভবিষ্যৎ। অর্থাৎ ওমানের সঙ্গে তেহরানের সমঝোতা হলেও সেটি বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে আরও বিস্তৃত কূটনৈতিক সমঝোতার ওপর।

এই পরিস্থিতি তেলের বাজারে দুই ধরনের বিপরীত প্রত্যাশা তৈরি করেছে। একদিকে হরমুজ খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা বাজারে সরবরাহ বাড়ার আশা তৈরি করছে, যা তেলের দাম কমাতে পারে। অন্যদিকে চুক্তি বিলম্বিত হলে কিংবা নতুন কোনো সামরিক বা কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হলে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা আবার বাড়তে পারে। ফলে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা এখন প্রতিটি কূটনৈতিক বার্তার দিকে সতর্ক নজর রাখছেন।

গত সপ্তাহে তেলের দাম ৭ শতাংশের বেশি কমে যাওয়ার ঘটনাটিও বাজারের এই সংবেদনশীলতার উদাহরণ। হরমুজ দ্রুত খুলে যেতে পারে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা সামনে আসে। কিন্তু এখন সেই প্রত্যাশার জায়গায় আবার অনিশ্চয়তা ফিরে আসায় তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী চাপ দেখা যাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির প্রভাব জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব ধীরে ধীরে পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের কাঁচামাল এবং বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামে পড়তে পারে। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে একই হারে প্রতিফলিত হয় না, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চমূল্য আমদানিকারক দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্যও আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের গতিপ্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। অপরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। এর সঙ্গে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের সম্পর্ক থাকায় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও পরোক্ষ চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো হরমুজ প্রণালি কবে এবং কী শর্তে স্বাভাবিকভাবে খুলবে। ইরান ও ওমান নতুন নৌপথ নিয়ে সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে তেহরান জানিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শর্তগুলো নিষ্পত্তি না হলে সেই সমঝোতা বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজার তাই আপাতত একটি কূটনৈতিক সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে। হরমুজ খুললে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কমে দাম আবার নিম্নমুখী হতে পারে। বিপরীতে আলোচনা ব্যর্থ হলে কিংবা প্রণালি চালুর প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে বাজারে ঝুঁকি বাড়বে। এমনকি নতুন কোনো সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে তেলের দাম আরও দ্রুত বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি তাই বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত। একটি সংকীর্ণ জলপথের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত অনিশ্চয়তা কীভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারের গতিপথ বদলে দিতে পারে, তেলের বাজারের সাম্প্রতিক ওঠানামা তারই উদাহরণ। এখন ইরান, ওমান ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক আলোচনার পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরই অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী দিনের জ্বালানি বাজারের দিকনির্দেশনা।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত