প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশে। কয়েক দিনের ব্যবধানে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীর বাইরে অনেক অঞ্চলে দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ও কয়লার সংকট, কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহ হ্রাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রোববার বিকেল ৩টার দিকে দেশে লোডশেডিং প্রায় ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। এটি আগের সপ্তাহের সর্বোচ্চ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের ঘাটতিকেও ছাড়িয়ে যায়। ওই সময়ে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় মাত্র ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট। পরে বিকেল ৫টার দিকে সরবরাহ কিছুটা বেড়ে প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াট হলেও তখনও প্রায় ২ হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের এই হিসাবের বাইরে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা পরিস্থিতির আরও কঠিন চিত্র তুলে ধরছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে গরমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। শিশু ও বয়স্কদের ভোগান্তি বাড়ছে, রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে এবং বিদ্যুৎনির্ভর ছোট ব্যবসা ও সেবামূলক কার্যক্রমও ক্ষতির মুখে পড়ছে। তীব্র গরমের সময় ফ্যান, বৈদ্যুতিক পাম্প বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে। বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক এক বিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি গ্যাস প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
রোববার বিকেল ৫টার দিকে দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫৮৯ মেগাওয়াট। অথচ এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ সক্ষমতার বড় একটি অংশ জ্বালানি সংকটের কারণে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের গুরুত্ব এবং সরবরাহ ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের প্রায় ৪২ শতাংশ বিদ্যুৎ খাতে যায় এবং গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৪৪ শতাংশ। গ্যাসের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
গ্যাসের পাশাপাশি কয়লা সংকটও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পায়রা, রামপাল, মাতারবাড়ী, এসএস পাওয়ারসহ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ বা কারিগরি সমস্যার কারণে উৎপাদন স্বাভাবিকের তুলনায় কম রয়েছে। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে রোববার সন্ধ্যার আগে উৎপাদন ছিল প্রায় ৭১০ মেগাওয়াট বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহ কমে যাওয়া। আদানি পাওয়ারের ঝাড়খণ্ডের কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত বিদ্যুৎ সরবরাহ সাধারণ পিক আওয়ারের প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট থেকে রোববার বিকেল ৫টার দিকে প্রায় ৮১৫ মেগাওয়াটে নেমে আসে। পিডিবির কাছে আদানি পাওয়ার জানিয়েছে, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কয়লা পরিবহনে সমস্যা হওয়ায় তাদের মজুত কমেছে এবং সে কারণে উৎপাদন কমাতে হয়েছে।
আদানির সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। কারণ দেশের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় আমদানি করা বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে একই সময়ে দেশীয় কয়েকটি বড় কেন্দ্র উৎপাদন কমালে ঘাটতি পূরণের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি বা দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমস্যার ফল নয়। বরং জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, আমদানি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারিগরি সক্ষমতা—সবগুলো জায়গায় চাপ তৈরি হওয়ায় সংকটটি জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ খাত নিয়ে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এবং গ্যাস সরবরাহের সীমাবদ্ধতাকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গ্যাস সংকটের সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে এলএনজি সরবরাহের সাময়িক ব্যাঘাত। ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর গ্যাস সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৫১ কোটি ঘনফুট কমে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে।
মেরামতের পর ৫ আগস্ট রাতে ওই টার্মিনাল থেকে আংশিকভাবে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। রোববার সন্ধ্যা ৬টার দিকে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে মোট প্রায় ৭৫৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। স্বাভাবিক সময়ে এই দুই টার্মিনাল থেকে সরবরাহ প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত ছিল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু হলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে নির্ধারিত সময়ে পূর্ণ সরবরাহ নিশ্চিত হবে কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। পূর্ণ সরবরাহ ফিরলে দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
বিদ্যুৎ সংকটের এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরি করছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত হলে কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে এবং জেনারেটর ব্যবহারের কারণে অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য দীর্ঘ লোডশেডিং সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিলম্ব, অর্ডার পূরণে সমস্যা এবং কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার মতো পরোক্ষ ক্ষতিও তৈরি হতে পারে।
বাসাবাড়িতেও পরিস্থিতির প্রভাব বহুমাত্রিক। বিদ্যুৎ না থাকলে শুধু আলো বা ফ্যান বন্ধ থাকে না; পানির পাম্প, মোবাইল ও ইন্টারনেটের চার্জিং, লিফট, রান্নাঘরের বিভিন্ন যন্ত্র এবং অন্যান্য দৈনন্দিন সুবিধাও ব্যাহত হয়। গরমের সময় এসব সমস্যা একসঙ্গে দেখা দিলে মানুষের ভোগান্তি দ্রুত বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট হলেও প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না—বর্তমান সংকটের অন্যতম বড় শিক্ষা এটিই। সক্ষমতা থাকা এবং সেই সক্ষমতা ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস, কয়লা বা অন্যান্য জ্বালানি থাকা এক বিষয় নয়। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, জ্বালানি সরবরাহে দুর্বলতা থাকলে বড় আকারের উৎপাদন সক্ষমতাও বাস্তবে কার্যকর থাকে না।
বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের জায়গাও এখানেই। গ্যাসের দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভর এলএনজি, কয়লা আমদানির ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা—সবকিছুর সঙ্গে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে একই সময়ে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও পরিবহনপথের ঝুঁকি বাড়লে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে জ্বালানি সরবরাহ, আর্থিক চাপ ও বহির্ভরতার ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
এ অবস্থায় তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো এবং বন্ধ বা কম উৎপাদন করা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব সচল করা জরুরি হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি সরবরাহের বৈচিত্র্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানো এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী অবশ্য সাধারণ মানুষ। দিনের পর দিন তীব্র গরমের মধ্যে কখন বিদ্যুৎ আসবে আর কখন চলে যাবে—এই অনিশ্চয়তা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলছে। বিদ্যুৎ সংকট সাময়িকভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হলেও ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ ও আর্থিকভাবে টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।