প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ উপকূলীয় জনপদ পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন দুর্গম চর হেয়ার ও চর আগারা এলাকায় সামুদ্রিক মাছ ধরার ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার এবং মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় গোটা এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় মৎস্যজীবী ও বৈধ ইজারাদারদের অভিযোগ অনুযায়ী, রাঙ্গাবালী দক্ষিণ ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজালাল মীর এবং তার অনুসারী একটি প্রভাবশালী চক্র সরকারের কাছ থেকে বৈধ উপায়ে ইজারা নেওয়া জেলেদের অবরুদ্ধ করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করছে। চাহিদামতো চাঁদার টাকা না দিলে অসহায় ও সাধারণ জেলেদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে ওই নেতার বিরুদ্ধে। সাগরের বিশাল বুক চিরে জীবিকা নির্বাহ করা এসব প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রা এই চাঁদাবাজি ও জবরদখলের কারণে মারাত্মকভাবে বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, বন বিভাগের নিয়ম মেনে ও সরকারি সমস্ত রাজস্ব পরিশোধ করে চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে শুরু করে আগামী ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এক বছরের জন্য চর হেয়ার ও চর আগারা এলাকায় মাছ আহরণের বৈধ ইজারা গ্রহণ করেন আ. আজিজ মাহমুদ ও আ. মান্নান ঢালী নামের দুই ব্যবসায়ী। কিন্তু সরকারিভাবে সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এবং ইজারা লাভ করার পরও স্থানীয় প্রভাবশালী বিএনপি নেতা মো. শাহজালাল মীরের বাধার কারণে জেলেরা তাদের নির্ধারিত কর্মক্ষেত্রে নামতে পারছেন না। ভুক্তভোগী জেলে হাসান গাজী গণমাধ্যমকে জানান যে, ইজারাদারদের অধীনে কর্মরত সাধারণ জেলেরা যখন সাগরে জাল ফেলতে যান, তখন শাহজালাল মীর ও তার পেটোয়া বাহিনী গতিরোধ করে ছয় লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলেই তাদের ওপর চড়াও হওয়া হয় এবং সাগরে নামলে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই এলাকায় শাহজালাল মীরের একটি গোপন সন্ত্রাসী বাহিনী সক্রিয় রয়েছে, যারা অতীতেও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অবৈধভাবে ফায়দা লুটেছে।

আরেক জেলে রাজীব খান অভিযোগ করে বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এই শাহজালাল মীর একই কায়দায় চর দখল করে রেখেছিলেন এবং সাধারণ জেলেদের ওপর নানা কায়দায় নির্যাতন চালিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটলেও ওই নেতার আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি; বরং তিনি আগের মতো এখনো অবৈধভাবে সেই দখলিস্বত্ব টিকিয়ে রাখার জোর অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মৎস্য ব্যবসায়ী ও বৈধ ইজারাদার আ. মান্নান ঢালী সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সরকারের কোষাগারে আইনানুগভাবে রাজস্ব জমা দিয়ে চর ইজারা নেওয়ার পরও বিএনপি নেতা শাহজালাল মীর ও তার লোকজন জেলেদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে তাদের চর থেকে উচ্ছেদ করেছে। তিনি আরও জানান যে, এর আগে ২০২৫ সালের জুলাই মাসেও একই চর তিনি ইজারা নিয়েছিলেন, কিন্তু তখনও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার জেলেদের মারধর করে চর জবরদখল করা হয়েছিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও ‘সাগর ইজারা দিয়েছেন এমপি’ শিরোনামে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়েছিল, যার নেপথ্য কারিগরও এই শাহজালাল মীর ছিলেন বলে তার দাবি। এলাকায় ‘সাগরের ত্রাস’ ও ‘সাগরের ইজারাদার’ হিসেবে পরিচিত এই প্রভাবশালী ব্যক্তিকে বখরা বা চাঁদা না দিয়ে কোনো জেলের পক্ষেই বঙ্গোপসাগরে জাল ফেলা বা মাছ শিকার করা সম্ভব হয় না।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে গত ২২ জুলাই জেলেদের পক্ষে জীবনের নিরাপত্তা ও আইনি প্রতিকার চেয়ে রাঙ্গাবালী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন ব্যবসায়ী আ. আজিজ মাহমুদ। অভিযোগকারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযুক্তকে একাধিকবার থানায় তলব করা হলেও তিনি ক্ষমতার প্রভাবে থানায় হাজির হননি এবং পুলিশ তাকে আইনের আওতায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে। অবিলম্বে এই চাঁদাবাজ চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে কোনো ধরনের মারধর, হয়রানি ও দখল-বাণিজ্য ছাড়াই উন্মুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশে সাগরে মাছ আহরণের সুযোগ সৃষ্টির জন্য তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এদিকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা শাহজালাল মীরের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি অত্যন্ত অদ্ভুত ও চাঞ্চল্যকর এক মন্তব্য করেন। তিনি স্বীকার করেন যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তিনি টাকা দিয়ে ওই চরে মাছ ধরতেন এবং বর্তমান সময়েও তিনি একই কায়দায় মাছ শিকার করে আসছেন। তিনি আরও দাবি করেন যে, এ বছর আ. আজিজ মাহমুদ ও আ. মান্নান ঢালী চরে মাছ ধরার সরকারি অনুমতিপত্র পেলেও উপজেলা বিএনপির সভাপতি তাকে ওই চরে মাছ ধরার মৌখিক নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাকে আলাদা একটি ‘অনুমতিপত্র’ পাইয়ে দেওয়ার জোরালো আশ্বাস দিয়েছেন। তবে জেলেদের ওপর শারীরিক নির্যাতন কিংবা ছয় লাখ টাকা চাঁদা দাবির বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে তিনি দাবি করেন। অন্যদিকে, দলীয় নেতার বিরুদ্ধে ওঠা চর দখল ও চাঁদাবাজির এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আ. রহমান ফরাজীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান। তিনি গণমাধ্যমকে জানান যে, চর বা এ ধরনের রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে কোনো মন্তব্য করলে তাকে নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হবে, তাই তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি নন।

এ বিষয়ে রাঙ্গাবালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জসিম উদ্দীন গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, এ সংক্রান্ত একটি লিখিত অভিযোগ তাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে থানায় হাজির হওয়ার জন্য একাধিকবার নোটিশ পাঠানো হলেও তিনি এখনো সাড়া দেননি বা থানায় উপস্থিত হননি। অন্যদিকে, চরমোন্তাজ রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা আবুল কালাম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, সরকারি কোষাগারে সঠিক নিয়মে রাজস্ব পরিশোধ করে যারা বৈধভাবে চর বা জলমহাল ইজারা লাভ করেছেন, কেবল আইনগতভাবে তারাই ওই নির্দিষ্ট এলাকায় মাছ ধরার পূর্ণ অধিকার রাখেন। এর বাইরে বেআইনিভাবে কেউ জোরপূর্বক জবরদখল বা চাঁদাবাজি করার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে দলের পদধারী নেতার এমন বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ফলে উপকূলীয় এলাকার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।