প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটিয়ে নতুন করে সহযোগিতার পথ খোঁজার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নানা উদ্যোগের মধ্যে সোমবারের এই বৈঠককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (১০ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে বৈঠকটি শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি-১ জাহিদুল ইসলাম রনি বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে বৈঠকে ঠিক কোন কোন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের বৈঠক দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান গতিপ্রকৃতির দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক পরিবর্তন, কূটনৈতিক টানাপোড়েন, বাণিজ্য ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তার পর নতুন করে সংলাপ ও যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
এর আগে গত ২৯ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছিলেন দীনেশ ত্রিবেদী। ওই সময় তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এমন কোনো সমস্যা নেই, যা পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর হলে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ে আরও অগ্রগতি হতে পারে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন।
সোমবারের বৈঠকের এক দিন আগে, রোববার যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতীয় ভিসা আবেদনকেন্দ্রে শিশুদের জন্য একটি খেলার জায়গা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন দীনেশ ত্রিবেদী। সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করেন তিনি।
ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে তারা সম্মান করেন এবং তাঁর বক্তৃতা তিনি একাধিকবার শুনেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান একজন জনবান্ধব নেতা। একই অনুষ্ঠানে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও জনবান্ধব নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হলে বিভিন্ন জটিলতার সমাধানের পথ সহজ হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন দীনেশ ত্রিবেদী। তাঁর বক্তব্যে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া যায়। তিনি বলেন, মানুষে মানুষে সম্পর্কের জায়গাটি শক্তিশালী হলে এবং দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লে সমস্যাগুলো ইতিবাচকভাবে সমাধান করা সম্ভব।
দীনেশ ত্রিবেদীর এমন বক্তব্যকে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের ইতিবাচক বার্তার অংশ হিসেবে দেখছেন। গত জুলাইয়েও তিনি বলেছিলেন, পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে দুই দেশের সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব। পাশাপাশি নয়াদিল্লি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরে স্বাগত জানাতে আগ্রহী বলেও জানিয়েছিলেন।
ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীর দায়িত্ব গ্রহণও বর্তমান সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদীকে এ বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের জন্য ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি পেশাদার কূটনীতিক প্রণয় ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হন।
জুনে দায়িত্ব নিতে বাংলাদেশে এসে দীনেশ ত্রিবেদী দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্যে দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রয়োজনীয়তাও উঠে আসে।
তাঁর নিয়োগ এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্কে নানা বিষয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাঁকে ফেরত পাঠানোর দাবি, সীমান্ত পরিস্থিতি, বাণিজ্য ও ভিসা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয় দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক পুনর্গঠনের আলোচনা জোরালো হয়েছে। ভারতের নতুন হাইকমিশনারের ধারাবাহিক বক্তব্যেও সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগকে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে।
তবে সম্পর্কের সামনে থাকা সমস্যাগুলো এক বৈঠকে সমাধান হওয়ার মতো নয়। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নদীর পানি বণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্য, জ্বালানি সহযোগিতা, ভিসা ব্যবস্থা, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো বিষয়গুলোতে নিয়মিত আলোচনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বাস্তব গুরুত্ব রয়েছে। দুই দেশের ভৌগোলিক নৈকট্য যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করলেও দীর্ঘদিনের বিভিন্ন জটিলতা অনেক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে বাধা দিয়েছে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দুই দেশ যদি নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান করতে পারে, তাহলে অর্থনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় তার প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব, পারস্পরিক সম্মান এবং সমতার ভিত্তিতে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লির জন্যও ঢাকার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক আঞ্চলিক যোগাযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠককে শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বৈঠকের আলোচ্যসূচি প্রকাশ না হলেও দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান পর্যায়ে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ নিজেই একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা বহন করে।
এর আগে ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের বিষয়টিও উঠে এসেছে। ভারতের পক্ষ থেকে সফরটির ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করা হলেও এর সময়সূচি বাংলাদেশের সরকারের অগ্রাধিকারের ওপর নির্ভর করবে বলে দীনেশ ত্রিবেদী জানিয়েছিলেন।
ভারতের নয়াদিল্লিতে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিশেষ অতিথি হিসেবে সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে ভারতীয় ও বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। ফলে সম্ভাব্য ভারত সফর দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি বৈঠকের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে সোমবারের বৈঠকটি এমন একটি সময়ে হলো, যখন ঢাকা ও নয়াদিল্লি উভয় পক্ষই সম্পর্কের নতুন ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করছে। অতীতের মতপার্থক্য ও অমীমাংসিত ইস্যুগুলো এক পাশে রেখে বাস্তব স্বার্থের জায়গা থেকে সহযোগিতা বাড়ানো সম্ভব কি না, আগামী দিনের কূটনৈতিক তৎপরতাই তার উত্তর দেবে।
দুই দেশের মানুষের মধ্যে ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে রাজনৈতিক সম্পর্কের ওঠানামার প্রভাব শুধু সরকার বা কূটনৈতিক মহলে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন, ব্যবসা, শিক্ষার্থী, রোগী, পর্যটক এবং দুই দেশের সাধারণ নাগরিকের ওপরও। সেই জায়গা থেকেই নিয়মিত সংলাপ ও পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি করা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক তাই ভবিষ্যৎ সম্পর্কের কোনো চূড়ান্ত ফল ঘোষণা না করলেও আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই যোগাযোগ পরবর্তী সময়ে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সংলাপ, সম্ভাব্য ভারত সফর এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোর বাস্তব সমাধানে কতটা গতি আনতে পারে।