প্রকাশ: ৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভারতের সঙ্গে একটি কার্যকর ও স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী ছিলেন বলে জানিয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তার মতে, ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতার কারণে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশকে ঘিরে থাকা তিন দিকের প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন বলেই মনে করতেন ড. ইউনূস।
একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তৌহিদ হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধান দুটি লক্ষ্য ছিল দেশের অভ্যন্তরে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নতুন সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে একটি কার্যকর কর্মসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবতা। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত, অর্থনৈতিক যোগাযোগ, পানিসম্পদ, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক রাজনীতির কারণে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব না দিয়ে কোনো পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
তৌহিদ হোসেনের দাবি, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ধরনের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পায়নি। তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অধ্যাপক ইউনূসকে স্বাগত জানিয়ে ভারতের আনুষ্ঠানিক বার্তাও দেরিতে এসেছিল।
সাবেক এই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ড. ইউনূসের প্রথম টেলিফোন আলাপের উদ্যোগও বাংলাদেশের পক্ষ থেকেই নেওয়া হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক যাতে শুরু থেকেই অস্বস্তিকর অবস্থায় না যায়, সে জন্য যোগাযোগ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল।
তৌহিদ হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের শেষ দিকে ড. ইউনূস তাকে দিল্লি হয়ে বিদেশ সফরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে তিনি মনে করেছিলেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ছাড়া এমন সফর কূটনৈতিকভাবে যথাযথ হবে না। শুধু সফর করলেই সম্পর্কের উন্নতি হবে—এমন নিশ্চয়তাও ছিল না বলে তিনি মনে করেছিলেন।
তার যুক্তি ড. ইউনূস গ্রহণ করেছিলেন উল্লেখ করে তৌহিদ হোসেন বলেন, সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শুরুতে যথেষ্ট আন্তরিক চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে সেই উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।
তিনি বলেন, “প্রথম দিকে আমরা বেশ চেষ্টা করেছি। পরে দেখা গেল, এটা একেবারেই ব্যর্থ প্রয়াস।” তবে সম্পর্কের অবনতির জন্য তিনি একক কোনো পক্ষকে দায়ী করেননি; বরং দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও পারস্পরিক অবস্থানের বিষয়টি সামনে তুলে ধরেছেন।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি নিজের দায়িত্ব পালনের সময় সরকারের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও কথা বলেন তৌহিদ হোসেন। তিনি জানান, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম তিন থেকে চার মাস তিনি অনেকটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছিলেন।
তার দাবি, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ, বিভিন্ন কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ড. ইউনূসের অংশগ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের অভ্যন্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরনে পরিবর্তন আসে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তৌহিদ হোসেন অভিযোগ করেন, পরে সরকারের ভেতরে একটি ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বা ঘনিষ্ঠ একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ভূমিকা বাড়তে থাকে। এর ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আগের মতো আলোচনা বা সমন্বয় থাকেনি বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে লুৎফে সিদ্দিকীর নিয়োগের বিষয়টি তাকে আগে জানানো হয়নি। এ ঘটনায় তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন বলে জানান। একইভাবে একটি মধ্যাহ্নভোজের বৈঠকে তাকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল, যেখানে নিজেকে অভিযুক্তের মতো মনে হয়েছিল।
ওই ঘটনার পর প্রথমবারের মতো দায়িত্ব ছাড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন বলেও জানান সাবেক এই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তার মতে, একটি সরকারের পররাষ্ট্রনীতি সফল করতে হলে অভ্যন্তরীণ সমন্বয়, পারস্পরিক আস্থা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তার দাবি, বিষয়টি তার সঙ্গে আলোচনা না করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এটি তাকে ব্যক্তিগতভাবে ব্যথিত করেছিল বলেও জানান তিনি।
পররাষ্ট্রনীতির সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে তৌহিদ হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম দিকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গিয়েছিল। তবে নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেই গতি কমে যায়।
চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও কিছু সম্ভাবনাময় উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে হলে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকার পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি বণ্টন, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলোতে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে।
তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যে উঠে এসেছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা ছিল। তবে সেই প্রচেষ্টা কতটা সফল হয়েছে, তা নির্ভর করেছে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও কূটনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন করে সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের নেতৃত্বের কূটনৈতিক দক্ষতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক বাস্তবতার ওপর।