হাসিনাকে ঘিরে দিল্লির অস্বস্তি, বদলাচ্ছে সমীকরণ

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৫ বার

প্রকাশ: ৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে দিল্লির কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্বস্তি ক্রমেই বাড়ছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকেরা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারত যে পরিস্থিতিতে হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবতা ও কূটনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে তার অবস্থানকে অনেকেই একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেছিলেন। তবে গত দুই বছরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পরিবর্তিত বাস্তবতায় হাসিনাকে ঘিরে ভারতের অবস্থান আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে।

দিল্লির কয়েকজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভারতের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কৌশল ও সাংগঠনিক অবস্থান নিয়ে যেসব পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর সঙ্গে হাসিনার অবস্থানের পুরোপুরি মিল হয়নি। বিশেষ করে দলের নেতৃত্ব কাঠামোতে সাময়িক বা সীমিত পরিবর্তনের যে সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, সেটিও তিনি গ্রহণ করেননি বলে দাবি করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফলে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে পরিবর্তনের যেকোনো প্রস্তাব তাঁর কাছে সহজভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক আশ্রয় ও ভারতের দীর্ঘদিনের নীতি

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া একটি সংবেদনশীল বিষয়। ভারত অতীতেও বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আশ্রয় দিয়েছে। দেশটির নীতিতে দীর্ঘদিন ধরে দেখা গেছে, ঘনিষ্ঠ মিত্র বা বিশেষ সম্পর্ক থাকা ব্যক্তিদের সংকটকালে মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।

তিব্বতের ধর্মীয় নেতা দালাই লামার ভারতে অবস্থান কিংবা আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহর পরিবারের আশ্রয়ের বিষয়গুলো এ ক্ষেত্রে প্রায়ই আলোচিত উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যেকটি পরিস্থিতির রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়া শুধু মানবিক সিদ্ধান্ত নয়, এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক হিসাবও জড়িত থাকে।

শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করা। কারণ বাংলাদেশ ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিবেশী দেশ।

ভূরাজনীতির চাপ বাড়ছে

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শক্তির স্বার্থ বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; এর সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থও জড়িয়ে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটি সংবেদনশীল ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে ভারত তার অবস্থান নিয়ে কূটনৈতিকভাবে সতর্ক ভূমিকা পালন করছে।

সম্প্রতি দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ভারত অবশ্য জানিয়েছে, ওই অনুষ্ঠানের আয়োজনের সঙ্গে তাদের সরাসরি কোনো ভূমিকা ছিল না।

‘সম্পদ’ নাকি ‘কূটনৈতিক চাপ’

ভারতের কূটনৈতিক মহলে শেখ হাসিনাকে নিয়ে যে মূল্যায়ন চলছে, তা নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। একসময় আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ভারতের জন্য কৌশলগত সুবিধা হিসেবে দেখা হতো। নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল।

তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি ভিন্ন হয়েছে। কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, শেখ হাসিনার উপস্থিতি এখন ভারতের জন্য একই সঙ্গে একটি কূটনৈতিক দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ, তাকে সমর্থন করলে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, আবার তাকে পরিত্যাগ করলেও দীর্ঘদিনের সম্পর্কের প্রশ্ন উঠতে পারে।

ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে কীভাবে স্থিতিশীল রাখা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি ও কৌশলগত প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা ভারতের জন্য অপরিহার্য।

হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং তার অবস্থানস্থল সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রের দাবি, তিনি নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশেই রয়েছেন।

তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি বারবার দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন এবং নিজের রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার কথা বলেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া তার প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। একদিকে রয়েছে ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও কৌশলগত সহযোগিতার প্রয়োজন, অন্যদিকে রয়েছে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা ও নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

দিল্লির জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে শেখ হাসিনার বিষয়টি সামাল দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা যায়। আর ঢাকার জন্য প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতিতে কীভাবে জাতীয় স্বার্থ ও কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হবে। আগামী দিনের আঞ্চলিক রাজনীতিতে এই সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত