হরমুজ সংকট কমাতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬২ বার

প্রকাশ: ৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

উপসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করেছে পাকিস্তান। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিরসনে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে তারা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা অব্যাহত রেখেছে।

বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট সমাধানে পাকিস্তান অন্যান্য ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট উত্তেজনা ও নৌ চলাচলের অনিশ্চয়তা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

তাহির আন্দ্রাবি বলেন, “পাকিস্তান উপসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানে আন্তরিক প্রচেষ্টায় অন্যান্য ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা নিরসনের বিষয়ে।”

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি নিয়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগকারী এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা বা নৌ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলে তা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তায় ওমানের ভূমিকারও প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরসংলগ্ন উপকূলীয় রাষ্ট্র হিসেবে ওমান সবসময় আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে আসছে।

আন্দ্রাবি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পাকিস্তান তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। ইসলামাবাদের লক্ষ্য হলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।

এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সম্প্রতি সৌদি আরব ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক টেলিফোন আলোচনা করেছেন। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আলোচনায় আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করেন তিনি।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব আলোচনায় লোহিত সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বাব আল-মান্দেব প্রণালির অবস্থা, ফিলিস্তিন সংকট এবং অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

এ ছাড়া ইসহাক দার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে পাকিস্তান আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে একটি মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছে।

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের বিরোধ। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হলেও বিভিন্ন নিরাপত্তা ইস্যুতে মতপার্থক্যের কারণে সেই প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে।

জানা গেছে, গত ১৮ জুন ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি কাঠামোগত চুক্তিতে পৌঁছায় এবং চূড়ান্ত সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনা শুরু করে। তবে পরবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং পারস্পরিক নিশ্চয়তার বিষয়গুলো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়। এর ফলে আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরে হামলা চালালে তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ার হুমকি দেয়। ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তারা জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতসহ কয়েকটি আরব দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জামকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে তা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই প্রভাবিত করবে না, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে একাধিক কৌশলগত কারণ রয়েছে। একদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে রয়েছে ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক যোগাযোগ। ফলে ইসলামাবাদ দুই পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে উত্তেজনা কমানোর একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা নিতে চাইছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান নিজেও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট জ্বালানি মূল্য, বৈদেশিক বাণিজ্য, প্রবাসী শ্রমবাজার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শান্তিপূর্ণ সমাধান পাকিস্তানের নিজস্ব স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত।

অন্যদিকে সৌদি আরব, ইরান ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে ইসলামাবাদ আঞ্চলিক কূটনীতিতে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন দেশ সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমঝোতার দিকে এগোতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

তবে হরমুজ প্রণালির সংকট কত দ্রুত সমাধান হবে, তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর। দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি ও নিরাপত্তা উদ্বেগ দূর করা না গেলে উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত করা কঠিন হতে পারে।

এদিকে পাকিস্তান জানিয়েছে, তারা আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে। ইসলামাবাদের এই কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা কমাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com