ভারত-ইসরাইল সম্পর্ক আরও জোরদারে ঐকমত্য, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩০ বার

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারত ও ইসরাইলের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও গভীর ও বহুমাত্রিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে নতুন করে অঙ্গীকার করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে দুই নেতার সাম্প্রতিক টেলিফোন আলাপ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। ফোনালাপে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি, স্বাস্থ্য, পানি ব্যবস্থাপনা এবং উদ্ভাবনসহ একাধিক খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার টেলিফোনে আলোচনার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জানান, তিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ফোন পেয়েছেন এবং দুই দেশের বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেছেন। তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠা ভারত-ইসরাইল সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জিত অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও দুই নেতা আলোচনা করেছেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্কের ধারাবাহিক উন্নয়নে উভয় নেতা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা ভবিষ্যতে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। একই সঙ্গে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বজায় রাখার বিষয়েও দুই নেতা সম্মতি জানিয়েছেন, যাতে উদ্ভূত যেকোনো আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সমন্বিতভাবে কাজ করা সম্ভব হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত ও ইসরাইলের সম্পর্ক কেবল দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সহযোগিতা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং উদীয়মান প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যেও দুই দেশের এই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আমন্ত্রণে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে ইসরাইল সফর করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দুই দিনের সেই সফরে উভয় দেশের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সফরকালে দুই নেতা ২০১৭ সালে মোদির ঐতিহাসিক ইসরাইল সফর এবং ২০১৮ সালে নেতানিয়াহুর ভারত সফরের বিষয়টিও স্মরণ করেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওই দুটি সফরের মধ্য দিয়েই ভারত-ইসরাইল সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায় এবং উভয় দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র বহুগুণ বিস্তৃত হয়।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত এক দশকে দুই দেশের সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, ড্রোন ব্যবস্থা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি প্রযুক্তি এবং পানি ব্যবস্থাপনায় ইসরাইল ভারতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সাম্প্রতিক ফোনালাপেও এই সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুই নেতা উদীয়মান প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, সাইবার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি আধুনিকায়ন, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্টার্টআপ উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে ইতিবাচক মত প্রকাশ করেন। পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুই দেশের সমন্বিত ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

যৌথ বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে শান্তি, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে ভারত ও ইসরাইল একসঙ্গে কাজ করবে। ইসরাইল যেখানে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ও গবেষণায় বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জন করেছে, সেখানে ভারত বৃহৎ মানবসম্পদ, উৎপাদন সক্ষমতা এবং দ্রুত সম্প্রসারিত প্রযুক্তি খাতের মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। এই দুই দেশের সক্ষমতা পরস্পরের পরিপূরক হওয়ায় ভবিষ্যতে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিও ফোনালাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনা, নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে দুই নেতা মতবিনিময় করেন। যদিও আলোচনার বিস্তারিত বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি, তবে কূটনৈতিক মহল মনে করছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত একদিকে ইসরাইলের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশের সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক অব্যাহত রাখার নীতি অনুসরণ করছে।

ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি বাস্তববাদী কৌশল লক্ষ্য করা গেছে। দেশটি একদিকে ইসরাইলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা জোরদার করছে, অন্যদিকে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতাও সম্প্রসারণ করছে। এই বহুমুখী কূটনৈতিক অবস্থান ভারতের বৈদেশিক নীতিকে আরও কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলেছে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের অভিমত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ও ইসরাইলের বর্তমান সম্পর্ক শুধু সরকার বা নেতৃত্বের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, গবেষণা, কৃষি প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং উদ্ভাবন খাতে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও গভীর হতে পারে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা উদ্ভাবন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার মতো নতুন খাতগুলোতে যৌথ বিনিয়োগ ও গবেষণার সম্ভাবনা বাড়ছে।

সব মিলিয়ে নরেন্দ্র মোদি ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক ফোনালাপ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ নয়; বরং এটি ভারত-ইসরাইল সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত