প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বাজারে আবারও বেড়েছে স্বর্ণের দাম। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) ভরিতে ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করেছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮ টাকা। মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটসহ এই দাম কার্যকর হয়েছে শনিবার ৮ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে। ফলে আজ সোমবার ১০ আগস্ট দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণ কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হবে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮ টাকা।
স্বর্ণের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় উভয় বাজারেই মূল্যবান এই ধাতুটির দামের ওঠানামা অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম বৃদ্ধিকে নতুন দর নির্ধারণের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে বাজুস। বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সংগঠনটি ভ্যাটসহ স্বর্ণের নতুন দাম ঘোষণা করেছে।
বাজুসের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম বা এক ভরি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮ টাকা। এর আগের দর ছিল ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৪ টাকা। অর্থাৎ মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এক ভরি স্বর্ণের দাম বেড়েছে ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা।
এর আগে গত ৭ আগস্টও স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছিল বাজুস। ওই দিন ভরিতে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমানো হয়েছিল। ফলে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নেমে এসেছিল ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৪ টাকায়। কিন্তু স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের দাম আবার বাড়ার পর নতুন করে দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে স্বর্ণের বাজারে নতুন মূল্য কার্যকর হয়।
চলতি বছর দেশের স্বর্ণবাজারে দামের এই ঘন ঘন পরিবর্তন ক্রেতা ও ব্যবসায়ী উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত মোট ১০০ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ দফায় দাম বাড়ানো হয়েছে, ৫০ দফায় কমানো হয়েছে এবং এক দফায় ভ্যাট সমন্বয় করা হয়েছে। অর্থাৎ স্বর্ণের বাজারে মূল্য পরিবর্তনের প্রবণতা কতটা দ্রুত হচ্ছে, এই পরিসংখ্যানেই তার একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়।
স্বর্ণের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। বিশেষ করে বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং সামাজিক বিভিন্ন আয়োজনে স্বর্ণালংকার কেনার প্রয়োজন যেসব পরিবারের রয়েছে, তাদের জন্য প্রতিটি ভরি স্বর্ণের কয়েক হাজার টাকা মূল্যবৃদ্ধি বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে অনেকে ভবিষ্যতের জন্য স্বর্ণকে সঞ্চয় বা মূল্য সংরক্ষণের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে বাজারে দাম বাড়া কিংবা কমার প্রতিটি পরিবর্তন তাদের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় তেজাবি স্বর্ণের মূল্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের পরিবর্তনের পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে বিশুদ্ধ স্বর্ণের দাম, মুদ্রার বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয়ের প্রভাবও বাজারদরে প্রতিফলিত হতে পারে। বাজুস এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে স্বর্ণের দর সমন্বয় করে থাকে।
বর্তমান দরের ক্ষেত্রে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরির দাম ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮ টাকা হলেও ক্রেতার চূড়ান্ত ব্যয় শুধু স্বর্ণের ঘোষিত দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অলংকার কেনার ক্ষেত্রে ডিজাইন, তৈরির মজুরি এবং প্রযোজ্য অন্যান্য চার্জ যুক্ত হওয়ার কারণে দোকানে পরিশোধযোগ্য মোট অর্থ আরও বেশি হতে পারে। তাই শুধু বাজুস ঘোষিত প্রতি ভরির মূল দাম দেখে অলংকারের চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।
স্বর্ণের বিশুদ্ধতার ভিত্তিতেও বাজারে দামের পার্থক্য রয়েছে। ২২ ক্যারেটের পাশাপাশি ২১ ক্যারেট ও ১৮ ক্যারেট স্বর্ণেরও আলাদা দর নির্ধারণ করা হয়। একইভাবে সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের ক্ষেত্রেও আলাদা মূল্য থাকে। ক্রেতাদের জন্য তাই অলংকার কেনার আগে স্বর্ণের ক্যারেট, ওজন, প্রতি ভরির নির্ধারিত দাম, মজুরি এবং প্রযোজ্য কর সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
স্বর্ণের বাজারে ঘন ঘন মূল্য পরিবর্তনের আরেকটি প্রভাব পড়তে পারে অলংকার ব্যবসায়ীদের ওপর। একদিকে বেশি দামে নতুন করে স্বর্ণ সংগ্রহ করতে হয়, অন্যদিকে আগের দামে কেনা স্বর্ণের মূল্য পরিবর্তিত হলে হিসাব-নিকাশেও সমন্বয় করতে হয়। বাজারে ক্রেতার চাহিদা কমে গেলে ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে স্বর্ণকে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাপী মূল্য সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, মুদ্রাবাজারের পরিবর্তন কিংবা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতায় পরিবর্তন এলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের চাহিদা ও দামেও প্রভাব পড়তে পারে। এসব বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে স্থানীয় বাজারের পরিস্থিতি যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের স্বর্ণের দামেও ওঠানামা দেখা যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের দামে একের পর এক সমন্বয় হওয়ায় বাজারের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহও বেড়েছে। কেউ দাম কমার অপেক্ষায় থাকছেন, আবার কেউ আরও দাম বাড়তে পারে এমন আশঙ্কায় আগেই কেনার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তবে স্বর্ণের দাম ভবিষ্যতে কোন দিকে যাবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক বাজার, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, স্থানীয় সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর দাম নির্ভর করতে পারে।
এদিকে চলতি বছরের ১০০তম মূল্য সমন্বয়ের হিসাবটি বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারের অস্থিরতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরছে। একদিকে ৪৯ বার দাম বেড়েছে, অন্যদিকে ৫০ বার কমেছে। অর্থাৎ দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি কমার ঘটনাও প্রায় সমান সংখ্যক হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, বাজারটি দীর্ঘ সময় একই দরে স্থির থাকছে না; বরং বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও বাজার পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় নিয়মিতভাবে মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে।
আজ ১০ আগস্ট দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের এক ভরি ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে অলংকার কেনার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত মূল্য জানার জন্য সংশ্লিষ্ট বিক্রেতার কাছ থেকে স্বর্ণের বর্তমান দর, ওজন, মজুরি ও অন্যান্য প্রযোজ্য খরচ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
স্বর্ণের দাম নিয়ে বাজারে পরবর্তী কোনো পরিবর্তন এলে বাজুসের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরই তা কার্যকর হবে। ফলে ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের জন্য সর্বশেষ ঘোষিত দর যাচাই করে লেনদেন করাই সবচেয়ে নিরাপদ।