হরমুজ নিয়ে সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে ইরান-ওমান

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হরমুজ প্রণালিতে একটি অস্থায়ী নৌপথ চালুর বিষয়ে ওমানের সঙ্গে ইরান একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর খুব কাছাকাছি রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে চলমান আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ ঘিরে চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যে ইরান ও ওমানের আলোচনাকে সংকট নিরসনের সম্ভাব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আরাগচির বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে একটি অস্থায়ী নৌপথ চালু করার বিষয়টি নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আলোচনার অগ্রগতির বিষয়ে তিনি বলেন, দুই পক্ষ একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর ‘খুব কাছাকাছি’ রয়েছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তির সময়সূচি বা এর বিস্তারিত শর্ত তিনি প্রকাশ করেননি।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য পরিবহন করা হয়। ফলে এই নৌপথের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ববাজারেও জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর দ্রুত প্রভাব পড়তে পারে।

এ কারণে হরমুজ প্রণালি ঘিরে যেকোনো উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ তৈরি করে। বিশেষ করে বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নৌপথটি স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগকে জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ইরানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে ওমান এখনো বিস্তারিত কোনো অবস্থান প্রকাশ করেনি। তবে ওমান দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বিরোধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে দেশটির কূটনৈতিক ভূমিকা অতীতেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফলে হরমুজ প্রণালির বর্তমান সংকটেও মাসকাটের সঙ্গে তেহরানের আলোচনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

একই সংবাদ সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান হরমুজ প্রণালির সংকট মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়েও কথা বলেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, কোনো সমঝোতা বা সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতে পারে। সে কারণে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থা বা দল থাকা প্রয়োজন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে আলোচনার মাধ্যমে সংকট ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর মতে, সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘন হলে তা মোকাবিলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, সামরিক সংঘাত বাড়ানো নয়। এই অবস্থান হরমুজ সংকটকে সামরিক উত্তেজনার বদলে কূটনৈতিক ও ব্যবস্থাপনাগত কাঠামোর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেয়।

ইরান-ওমানের এই আলোচনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ চলাচল নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ রয়েছে। গত কয়েকদিনে নৌপথটি আবার স্বাভাবিকভাবে চালু হবে কি না, তা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হয়েছে। সম্ভাব্য সমঝোতার খবর প্রকাশের পর জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি এলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে—এমন নিশ্চয়তা এখনো পাওয়া যায়নি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও এই সংকটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে নতুন কোনো সামরিক অভিযান শুরু না করে অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার কৌশল নিতে পারে তাঁর প্রশাসন।

ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র আপাতত বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি কিছু বলছে না। একই সঙ্গে তিনি ইরানের ওপর সমুদ্রপথে মার্কিন নৌবাহিনীর কার্যকর অবরোধের প্রভাবের কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, এই চাপ ইরানের সরকারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে এবং দেশটির চলমান অর্থনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করেছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান এবং ইরান-ওমানের আলোচনার মধ্যে সরাসরি কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা—তিনটি বিষয়ই পাশাপাশি এগোচ্ছে।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্বের কারণে এই সংকটের সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে শুধু ইরান ও ওমান নয়, বিশ্বের প্রধান জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোরও আগ্রহ রয়েছে। এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলো বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে পরিবহন ব্যয়, বীমা ব্যয় এবং জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্য—সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়তে পারে।

একই সঙ্গে হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কোনো সামরিক উত্তেজনা বা নৌযান চলাচলে বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য ঝুঁকি বাড়বে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত জ্বালানি, পরিবহন এবং বিভিন্ন পণ্যের মূল্যেও পড়তে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি অস্থায়ী নৌপথ চালুর বিষয়ে সমঝোতা হলে তা অন্তত স্বল্পমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা কমাতে পারে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, কতদিন চালু থাকবে এবং নৌপথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা থাকবে—তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত চুক্তির শর্তের ওপর।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, হরমুজ সংকটের স্থায়ী সমাধান শুধু একটি নৌপথ খোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সরাসরি জড়িত। ফলে সাময়িক নৌপথ চালু হলেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য কূটনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজন থাকবে।

বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ইরান ও ওমানের আলোচনা শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ নেয় কি না। আরাগচির বক্তব্যে আলোচনার অগ্রগতির ইঙ্গিত মিললেও আনুষ্ঠানিক চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি পুরোপুরি নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।

তবে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলমান থাকা এবং সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হওয়া আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর একটি সুযোগ তৈরি করেছে। এখন সেই সুযোগ কতটা বাস্তব ফল বয়ে আনে, তার ওপর নির্ভর করছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি নৌপথের ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া।

আরো খবর জানতে ক্লিক করুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত