প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বরগুনায় মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের অভিযোগে এক বাদীকে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় খালাস পাওয়া আসামিকে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতের এই রায়কে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুধবার (২৯ জুলাই) দুপুরে বরগুনার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. ইকবাল মাসুদ এ রায় দেন। পরে রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন আদালতের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা আকতার হোসেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত মোশারফ হোসেন ওরফে হারুন অর রশীদ বরগুনার বামনা উপজেলার বুকাবুনিয়া ইউনিয়নের ছোনবুনিয়া গ্রামের সেকান্দার আলীর ছেলে। অন্যদিকে মামলায় খালাস পাওয়া একেএম শহিদুল ইসলাম গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সালনা বাজার এলাকার বাসিন্দা।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর একেএম শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনে বামনা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন মোশারফ হোসেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছিল, মোশারফের ছেলেকে কানাডায় পাঠানোর কথা বলে শহিদুল ইসলাম ১৫ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। পরে তাকে বিদেশে পাঠানো হয়নি এবং ওই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মামলাটি দায়েরের পর দীর্ঘ সময় ধরে বিচারিক কার্যক্রম চলে। তবে বিচারপ্রক্রিয়া শেষে অভিযোগের পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপিত না হওয়ায় আদালত একেএম শহিদুল ইসলামকে খালাস দেন। একই সঙ্গে মামলাটি ভিত্তিহীন ও হয়রানিমূলক ছিল বলে আদালত অভিমত দেন।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণের পর মামলার বাদী মোশারফ হোসেনের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত ২০ জুলাই তাকে সশরীরে আদালতে হাজির হয়ে মামলাটি দায়েরের কারণ ব্যাখ্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত দিনে তিনি আদালতে উপস্থিত হননি। আদালত সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি আত্মগোপনে ছিলেন।
এরপর আদালত ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ২৫০(২) ধারার বিধান অনুসারে মোশারফ হোসেনকে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে মামলায় খালাস পাওয়া একেএম শহিদুল ইসলামকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে ওই ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ করতে বলা হয়েছে।
আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে মামলার দুই পক্ষের অবস্থানও ভিন্ন পরিণতি পেয়েছে। যে ব্যক্তি প্রতারণার অভিযোগ এনে মামলা করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাকেই মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের দায়ে সাজা পেতে হয়েছে। আর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল, তিনি বিচারিক প্রক্রিয়ায় খালাস পাওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নির্দেশ পেয়েছেন।
চিফ জুডিশিয়াল আদালতের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা আকতার হোসেন জানান, মামলায় বাদীর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং খালাসপ্রাপ্ত আসামিকে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন। শুনানির সময় বাদী আদালতে উপস্থিত না থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতে মামলা করার অধিকার নাগরিকের মৌলিক আইনি সুযোগের অংশ হলেও সেই সুযোগের অপব্যবহার গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো ব্যক্তিকে হয়রানি, চাপ সৃষ্টি কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ মেটানোর উদ্দেশ্যে মিথ্যা অভিযোগে মামলা করা হলে তার আইনি পরিণতি হতে পারে। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলার কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় ধরে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা তার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আর্থিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বরগুনার এই মামলার ঘটনাও সেই বাস্তবতার দিকটি সামনে এনেছে। একটি অভিযোগের ভিত্তিতে শুরু হওয়া বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত আদালতের পর্যবেক্ষণে ভিত্তিহীন ও হয়রানিমূলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাদীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত আসামির জন্য ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
তবে এ ধরনের মামলায় আদালতের রায়ের পূর্ণাঙ্গ আদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করেই আইনি ব্যাখ্যা করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া এবং কোনো অভিযোগ ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার মধ্যে আইনগত পার্থক্য রয়েছে। বরগুনার ঘটনায় আদালত বাদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় ব্যবস্থা নিয়েছেন।
আদালতের এই রায় একই সঙ্গে বিচারপ্রার্থীদের জন্য একটি বার্তা বহন করছে—আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি সেই অধিকার দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবহার করাও জরুরি। কোনো অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতের সামনে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। অন্যথায় বিচারপ্রক্রিয়াকে ব্যক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগে উল্টো আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে।
বরগুনার এই ঘটনায় এখন দণ্ডপ্রাপ্ত মোশারফ হোসেনের বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। একই সঙ্গে রায়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খালাসপ্রাপ্ত একেএম শহিদুল ইসলামকে ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিল, আদালতে দায়ের করা প্রতিটি অভিযোগের পেছনে যথাযথ তথ্য ও প্রমাণ থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিচারিক প্রক্রিয়া কেবল অভিযোগকারীর বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে না; শেষ পর্যন্ত অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের দায়িত্বও আইনি কাঠামোর মধ্যেই নির্ধারিত হয়। আর অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে তার দায় থেকেও বাদী সবসময় মুক্ত থাকবেন—এমন নয়।