প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ইতিহাসে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে এক নজিরবিহীন ধস নেমেছে। ১৫ বছরের সব রেকর্ড ভেঙে এবার পাসের হার নেমে এসেছে মাত্র ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে যেখানে পাসের হার ছিল ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ, সেখানে এবার তা এক লাফে ১২ দশমিক ৬১ শতাংশ কমে গেছে। শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধানত গণিত এবং ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের চরম বিপর্যয়ই সামগ্রিক ফলাফলকে সবচেয়ে নিচের স্তরে নামিয়ে এনেছে। অন্য সব বিষয়ে পাসের হার ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশের ওপরে থাকলেও এই দুটি ভীতিপ্রদ বিষয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, যা পুরো অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থায় গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষায় এবার ইংরেজি এবং গণিত বিষয় দুটি শিক্ষার্থীদের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সাফল্য সন্তোষজনক হলেও ইংরেজি প্রথমপত্র এবং গণিত বিষয়ে পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। ইংরেজিতে সর্বনিম্ন পাসের হার ৭২ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং গণিতে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন পাসের হার ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে। এই দুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেবল চট্টগ্রাম অঞ্চলেই ৬০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, কেবল ইংরেজিতেই ৩৫ হাজার ৮৬৬ জন এবং গণিতে ২৫ হাজার ৭৭৩ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের ইতিহাসে এমন ভয়াবহ বিপর্যয় এর আগে কখনোই দেখেনি চট্টগ্রাম বোর্ড।

শিক্ষার্থীদের এই বিপর্যয়ের পেছনের কারণ খুঁজতে গিয়ে শিক্ষা বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের ওপর আলো ফেলেছেন। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. মো. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ইংরেজি ও গণিতে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি অনীহা, নির্ধারিত সিলেবাসে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্দোলনমুখী কার্যক্রমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার প্রবণতাও এই ফলাফলের জন্য দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বোর্ড সচিব জহিরুল হক স্বপন যোগ করেছেন যে, গণিতে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং ইংরেজিতে ভাষাগত দক্ষতার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দুটি বিষয়ে নিয়মিত পড়াশোনা এবং বাড়তি সময় দেওয়ার কথা থাকলেও শিক্ষার্থীরা তা অবহেলা করেছে।
শুধু পাসের হারেই নয়, জিপিএ ৫ অর্জনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। গত বছর যেখানে ১১ হাজার ৮৪৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ অর্জন করেছিল, এবার সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৩৯৮ জনে। অর্থাৎ এক বছরে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২ হাজার ৪৪২৫ জন। সামগ্রিক ফলাফলের এই নিম্নমুখী প্রবণতায় ছাত্রীরা ছাত্রদের চেয়ে সামান্য এগিয়ে থাকলেও সামগ্রিকভাবে কোনো বিভাগই ভালো করতে পারেনি। বিভাগভিত্তিক ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যায় মানবিক বিভাগে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা তৈরি হয়েছে। গত বছর মানবিক বিভাগে পাসের হার ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ থাকলেও এবার তা ধসে পড়ে মাত্র ৩৮ দশমিক ৭৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে গতবারের ৭৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ থেকে কমে পাসের হার হয়েছে ৬০ দশমিক ১২ শতাংশ এবং বিজ্ঞান বিভাগে গতবারের ৯২ দশমিক ৫৭ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৮৪ দশমিক ৪১ শতাংশে।
অন্যান্য বিষয়ে পাসের হার সন্তোষজনক হলেও এই দুই বিষয়ের ভারে পুরো বোর্ডের চিত্র পাল্টে গেছে। তথ্য এবং যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে পাসের হার ছিল ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ, বাংলায় ৯৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ, খ্রিষ্টান ধর্মে ৯৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ, হিন্দু ধর্মে ৯৯ দশমিক ৫০ শতাংশ, জীববিজ্ঞানে ৯৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ, রসায়নে ৯৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ব্যবসায় উদ্যোগে পাসের হার ছিল ৯৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। তবে এই আশাজাগানিয়া পরিসংখ্যানগুলো শেষ পর্যন্ত গণিত ও ইংরেজির ভরাডুবির কারণে ম্লান হয়ে গেছে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, এবারের পরীক্ষায় আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। শতভাগ ফেল করা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে নারায়ণহাট গার্লস হাইস্কুল, আন্দর মানিক মাইছছড়ি জুনিয়র হাই স্কুল, মহালছড়ি হাইস্কুল, উরিরচর জুনিয়র হাইস্কুল, ভাইবোন ছড়া গার্লস হাইস্কুল, জারুলছড়ি হেডম্যানপাড়া হাইস্কুল, তারাবানিয়া হাইস্কুল এবং বাঘাইছড়ির শিলজাক দজার বাজার জুনিয়র স্কুল। প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন বিপর্যয় কেন ঘটল, তা খতিয়ে দেখতে স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষাবিদেরা দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেಷণে দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বোর্ডের পাসের হার কখনোই ৭২ শতাংশের নিচে নামে নাই। ২০১১ সালে ৭৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ, ২০১২ সালে ৭৯ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৯১ দশমিক ৪২ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৮২ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৯০ দশমিক ৪৬ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৮৪ দশমিক ১৩ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৭৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৭৮ দশমিক ১৭ শতাংশ, ২০২০ সালে ৮৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ, ২০২১ সালে ৯১ দশমিক ১৩ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৮২ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ পাস রেকর্ড করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিয়ে এবার পাসের হার ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমে আসায় অভিভাবক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক হতাশা বিরাজ করছে।
ফল প্রকাশের পর থেকে অভিভাবক মহলে তীব্র উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। কীভাবে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিশেষ করে ইংরেজি এবং গণিতে অকৃতকার্য হলো, তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। শিক্ষক ও শিক্ষাবিদেরা মনে করছেন, কেবল শিক্ষার্থীদের দোষ দিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদানের মান উন্নত করা, শিক্ষকদের মনিটরিং জোরদার করা এবং শিক্ষার্থীদের ভীতি দূর করার জন্য বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আগামী দিনে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এই ফলাফল বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সুদূরপ্রসারী এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।