প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনটি সাধারণত শিক্ষার্থী ও পরিবারের জন্য আনন্দ, স্বস্তি আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার দিন। কেউ কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়, কেউ আবার ফল প্রত্যাশামতো না হলে নতুন করে পথচলার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার শিহাব হোসেনের পরিবারের কাছে এবারের ফল প্রকাশের দিনটি হয়ে উঠেছে গভীর শোকের। যে ফলের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করেছিল একটি পরিবার, সেই ফল হাতে এসেছে সন্তানের মৃত্যুর মাত্র দুই দিন পর।
শাহরিয়ার হোসেন শিহাব (১৭) এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগত অর্জনটি নিজের চোখে দেখে যেতে পারেনি মেধাবী এই কিশোর। ফল প্রকাশের মাত্র দুই দিন আগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তার আকস্মিক মৃত্যু হয়। ফলে অন্য পরিবারগুলোর মতো শিহাবের ফল নিয়ে কোনো উচ্ছ্বাস নেই; বরং সাফল্যের খবরের সঙ্গে মিশে আছে হারানোর অসহনীয় বেদনা।
শিহাব কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শশীদল ইউনিয়নের মানরা গ্রামের গাজীর বাড়ির মো. তফাজ্জাল হোসেনের ছেলে। তার বাবা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। দুই ভাই-বোনের মধ্যে শিহাব ছিল বড়। পরিবারের সঙ্গে গাজীপুরে বসবাস করায় সে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ঢাকা বিমানবন্দর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
পরিবারের সদস্যদের জন্য শিহাব শুধু একজন পরীক্ষার্থী ছিল না; সে ছিল ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন দেখা একটি পরিবারের বড় সন্তান। ছোট চাচার বিয়েতে অংশ নিতে পরিবারের সঙ্গে গাজীপুর থেকে গ্রামের বাড়িতে এসেছিল সে। বিয়েবাড়ির ব্যস্ততা, আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা এবং আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যেই ঘটে যায় এমন একটি দুর্ঘটনা, যা মুহূর্তে পুরো পরিবারকে শোকে স্তব্ধ করে দেয়।
পরিবারের সূত্রে জানা যায়, গত ৮ আগস্ট গ্রামের বাড়িতে বৌভাতের আয়োজন চলছিল। দুপুরে গোসল শেষে ভেজা কাপড় শুকাতে বাড়ির ছাদে ওঠে শিহাব। কাপড় ছাদের কার্নিশে দেওয়ার সময় ডেকোরেশনে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক আলোর তারের সংস্পর্শে এসে সে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়। এরপর ছাদ থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয়।
ঘটনার পর স্বজনরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর শিহাবকে মৃত ঘোষণা করেন। স্বজনদের কাছে বিয়ের আনন্দের মুহূর্তটি তখনই পরিণত হয় শোকের ঘটনায়। যে বাড়িতে অতিথিদের আনাগোনা ও বিয়ের আয়োজন ঘিরে উৎসবের আবহ ছিল, সেখানে নেমে আসে কান্নার পরিবেশ।
এর মাত্র দুই দিন পর, ১০ আগস্ট প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল। ফলাফলে শিহাব জিপিএ-৫ অর্জন করেছে বলে জানা যায়। তার এই ফল পরিবারের জন্য একই সঙ্গে গর্ব ও বেদনার প্রতীক হয়ে এসেছে। একদিকে সন্তানের মেধা ও পরিশ্রমের সাফল্য, অন্যদিকে সেই সাফল্য উদ্যাপন করার মতো সন্তানটি আর নেই।
শিহাবের আকস্মিক মৃত্যুতে স্থানীয় এলাকাতেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শশীদল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান রিয়াদ বলেন, শিহাবের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, ছেলেটি ভালো পরীক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু নিজের অর্জিত ফলাফল দেখার সুযোগ তার হয়নি।
শিহাবের গল্পটি কেবল একটি দুর্ঘটনায় একটি তরুণ প্রাণ হারানোর ঘটনা নয়; এটি একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের আকস্মিক থেমে যাওয়ার গল্পও। এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় একজন শিক্ষার্থীর সামনে থাকে নানা প্রত্যাশা—ভালো ফল করা, উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যাওয়া, নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়াশোনা করা এবং একসময় পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া। শিহাবও নিশ্চয়ই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন স্বপ্ন দেখেছিল। জিপিএ-৫ সেই স্বপ্নের পথে তার মেধা ও পরিশ্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হয়ে এসেছে। কিন্তু সেই স্বীকৃতির মুহূর্তেই তার অনুপস্থিতি পরিবারকে আরও গভীরভাবে অনুভব করাচ্ছে।
ফল প্রকাশের দিনে শিক্ষার্থীদের ঘরে সাধারণত ফোন আসে, আত্মীয়স্বজন শুভেচ্ছা জানান, বন্ধুদের মধ্যে আনন্দ ভাগাভাগি হয়। অনেক পরিবার সন্তানের সাফল্য উদ্যাপনের জন্য মিষ্টি বিতরণ করে। কিন্তু শিহাবের পরিবারে এবার সেই চিত্র নেই। সেখানে সন্তানের ফলাফল হয়তো গর্বের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, আবার একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিচ্ছে তার না থাকার বাস্তবতাও।
শিহাবের মৃত্যু আরও একবার দেখিয়ে দিল, দৈনন্দিন জীবনে বৈদ্যুতিক সংযোগ ও সাময়িক ডেকোরেশনের ব্যবস্থাপনাতেও কতটা সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে বাড়িঘর সাজাতে অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক তার, আলোকসজ্জা ও সাময়িক সংযোগ ব্যবহার করা হয়। এসব সংযোগ সঠিকভাবে স্থাপন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে তা মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। উৎসবের সময় তাই বিদ্যুৎ-নিরাপত্তাকে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়।
একটি পরিবারের কাছে সন্তানের ফলাফল শুধু একটি গ্রেড বা একটি সনদ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু বছরের পরিশ্রম, আশা এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। শিহাবের জিপিএ-৫ তাই তার পরিবারের কাছে একদিকে মেধাবী সন্তানের শেষ সাফল্যের স্মারক, অন্যদিকে অপূর্ণ থেকে যাওয়া ভবিষ্যৎ স্বপ্নের প্রতীক।
সোমবারের ফল প্রকাশের পর অন্য শিক্ষার্থীরা যখন নতুন শিক্ষাজীবনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে, শিহাবের পরিবার তখন স্মৃতির ভেতর খুঁজছে তাদের প্রিয় সন্তানকে। জিপিএ-৫ পাওয়া শিহাব হয়তো নিজের ফলাফল জানতে পারেনি, কিন্তু তার এই অর্জন পরিবারের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে। তার মেধার স্বীকৃতি হয়ে থাকা এই ফলাফল আনন্দের চেয়ে বরং এখন তাদের কাছে এক গভীর নীরব কান্নার নাম।