প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি মালিকানাধীন এবং নিয়ন্ত্রিত আলোচিত সামাজিক মাধ্যম ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে চরম ধস নেমেছে এবং আর্থিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রান্তিক বা কোয়ার্টারে কোম্পানিটির বিশাল অঙ্কের লোকসান হয়েছে, যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় তেইশ কোটি আশি মিলিয়ন বা ২৩ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারে। ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবসার সুনির্দিষ্ট গণ্ডি পেরিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ খাতসহ বিভিন্ন নতুন ও বৈচিত্র্যময় খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ এবং ব্যবসা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করার চটকদার প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতেই কোম্পানিটিকে এই নজিরবিহীন আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছে। এই গ্রুপের মূল আকর্ষণ এবং মালিকানাধীন জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালের ব্যবসায়িক প্রসার ঘটানোর জন্য বিভিন্নমুখী উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আদতে কোম্পানিটির জন্য বড় ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত অফিশিয়াল আর্থিক প্রতিবেদন সূত্রে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে যে, বিগত বছর অর্থাৎ আগের বছরের ঠিক একই হিসাবকালের তুলনায় বর্তমান বছরের লোকসানের পরিমাণ প্রায় দশ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের দারুণভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। যদিও চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ট্রাম্প মিডিয়ার মোট আয় বা রেভিনিউ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে ১৭ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছিল এবং তা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮৯ শতাংশ বেশি ছিল বলে দাবি করা হয়েছে, তবুও সামগ্রিক ডিজিটাল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে হঠাৎ মূল্যপতন এবং ভুল বিনিয়োগ নীতির কারণে তাদের এই সামান্য আয় সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে বিশাল এক আর্থিক লোকসানে রূপ নিয়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকের হিসাবকাল শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প মিডিয়া দাবি করেছে যে তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ কোটি ডলার, যার মধ্যে নগদ অর্থ, স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন ধরনের আর্থিক বিনিয়োগ এবং ডিজিটাল মুদ্রাসহ তরল সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯০ কোটি ডলার।

ব্যবসায়িক এই বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ট্রাম্প মিডিয়া এখন তাদের মূল ভিত্তি অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবসায় আবারও নতুন করে পূর্ণ মনোযোগ নিবেদন করার কৌশল গ্রহণ করেছে। এই নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে তারা সম্প্রতি একটি অভিনব সেবা বা সার্ভিস চালু করার ঘোষণা দিয়েছে, যা ইতিমধ্যে দেশজুড়ে এবং করপোরেট মহলে তীব্র বিতর্ক ও আলোচনার ঝড় তুলেছে। এই বিশেষ সেবার মূল বৈশিষ্ট্য হলো, এর প্রদেয় গ্রাহকেরা বা সাবস্ক্রাইবাররা ট্রুথ সোশ্যালের অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যবহারকারীদের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট বা মতামত সাধারণ মানুষের অনেক আগে আগে দেখতে পারবেন, যার মাধ্যমে শেয়ারবাজার বা অন্যান্য আর্থিক বাজারে ওই পোস্টগুলোর সম্ভাব্য প্রভাব আগে থেকেই অনুমান করে লাভবান হওয়া সম্ভব। গ্রুপের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও কেভিন ম্যাকগার্ন সোমবার গণমাধ্যমের কাছে জানিয়েছেন যে ইতিমধ্যে এই নতুন সেবায় দশজনেরও বেশি প্রিমিয়াম গ্রাহক বা সাবস্ক্রাইবার সফলভাবে যুক্ত হয়েছেন। এই সম্পূর্ণ নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ ও এর সার্বিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্যের জন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সাধারণত যেকোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান তাদের মূল ব্যবসা সম্প্রসারণ করলে তা থেকে মুনাফা ও লাভের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা থাকলেও ট্রাম্প মিডিয়ার ক্ষেত্রে তার সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা গেছে। মূল গণমাধ্যম ব্যবসা থেকে সরে এসে ক্রিপ্টোকারেন্সি ডিজিটাল মুদ্রা নিজের ভান্ডারে জমা করে রাখার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতেও বড় অংকের বিনিয়োগের মতো বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ খাতে তারা হাত বাড়িয়েছিল। বিখ্যাত বৈশ্বিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান টেন এক্স রিসার্চের স্বনামধন্য বিশ্লেষক মার্কাস থিয়েলেন এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করে বলেছেন যে, ট্রাম্প মিডিয়া বর্তমান সময়ে এসে মূলত একটি খাঁটি গণমাধ্যমকেন্দ্রিক ক্রিপ্টোকারেন্সি ধারণকারী কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়েছে। তাদের বর্তমান আর্থিক বিবরণীতে যে বিশাল অংকের লোকসান পরিলক্ষিত হচ্ছে, তার সিংহভাগই এই অতি ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরিকল্পিত বিনিয়োগ কৌশলের প্রত্যক্ষ ফল। বিশ্লেষক থিয়েলেন আরও উল্লেখ করেছেন যে, ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবসার বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো অন্যান্য বৈচিত্র্যময় খাতেও তারা নিজেদের ব্যবসার পরিসর বাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছে, যেখান থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো ধরনের উল্লেখযোগ্য এবং স্থায়ী আর্থিক আয় বা মুনাফা ঘরে তুলতে পারেনি এই প্রতিষ্ঠানটি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে এবং রাজনৈতিক প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রায়শই এই নিজস্ব প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করে বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘোষণা দিয়ে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত জুলাই মাসে ট্রাম্প মিডিয়ার পক্ষ থেকে অত্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, ট্রুথ সোশ্যালে প্রকাশিত প্রেসিডেন্ট বা অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যেকোনো পোস্ট ওয়াল স্ট্রিটের নামী-দামি শেয়ারবাজারের ব্যবসায়ীদের কাছে অতিদ্রুত ও বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার একটি সেবা চালু করা হবে। এর ফলে এই বিশেষ ও ব্যয়বহুল সেবার গ্রাহক বা ক্রেতারা শেয়ারসহ বাজারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ কেনাবেচার ক্ষেত্রে সাধারণ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের তুলনায় অনেক বড় ধরনের বাড়তি ও অনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। এই সামগ্রিক উদ্যোগটিকে ঘিরে মার্কিন রাজনৈতিক ও করপোরেট মহলে তীব্র আইনি, নৈতিক এবং স্বার্থের সংঘাত সংক্রান্ত গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ট্রাম্প পরিবারের সদস্যরা এখনও পর্যন্ত এই ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপের সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারের মূল মালিক হিসেবে বহাল রয়েছেন। এমন একটি সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে একজন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বক্তব্য বা মতামত থেকে তাঁর নিজ পরিবারের মালিকানাধীন এই বাণিজ্যিক কোম্পানিটি আর্থিকভাবে সরাসরি লাভবান হতে পারে কি না, তা নিয়ে দেশজুড়ে চরম বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

সোমবার অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রকাশিত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে ট্রাম্প মিডিয়া জোরালোভাবে দাবি করেছে যে তাদের এই নতুন প্রবর্তিত সেবাটি আগামী দিনে কোম্পানির জন্য আয়ের একটি সম্পূর্ণ নতুন ও শক্তিশালী উৎস হয়ে উঠতে পারে বলে তারা প্রবল আশাবাদী। গ্রুপের অন্তর্বর্তীকালীন সিইও কেভিন ম্যাকগার্ন এই প্রসঙ্গে আশাবাদী সুরে বলেছেন যে, কোম্পানির সামগ্রিক ব্যবসায়িক অগ্রগতির এই গতিপ্রকৃতিতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত উৎসাহিত বোধ করছেন এবং আগামী প্রান্তিকগুলোতে কোম্পানির এই রূপান্তর ও আর্থিক অগ্রগতি সম্পর্কে সম্মানিত শেয়ারহোল্ডারদের আরও নিয়মিতভাবে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে অবহিত করা হবে। তিনি আরও যোগ করেছেন যে তাদের কোম্পানি বর্তমানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নতুন ব্যবসায়িক অধ্যায়ে পদার্পণ করছে, যা ভবিষ্যতে তাদের ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। তবে অর্থনৈতিক গবেষক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ মনে করছে যে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রভাব এবং ক্রিপ্টোবাজারের প্রবল অস্থিরতার মাঝে ট্রাম্প মিডিয়ার এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।