প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠেয় বহুল আলোচিত ও আন্তর্জাতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন না বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকার পক্ষ থেকে এই সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে নয়াদিল্লিকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে এই সম্মেলনে উপস্থিত না থাকলেও তাঁর একজন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা ঘোষণা দেওয়া হয়নি। মূলত বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আমন্ত্রণলিপিতে প্রটোকল লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই এই সতর্কতামূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এর আগে গত সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান গণমাধ্যমকে পরিষ্কার জানিয়েছিলেন যে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের ব্যাপারে সরকারের নীতিনিধারক মহলে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রধান অতিথি বা এককভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, বরং আমন্ত্রণপত্রটি পাঠানো হয়েছে আঞ্চলিক সংস্থা বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে। গত ১৪ জুলাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে তারেক রহমানকে আগামী ১২ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে একটি কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়েছিলেন। ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে পাঠানো ওই আমন্ত্রণপত্রে তারেক রহমানের নামের আগে ‘প্রধানমন্ত্রী’ পদবিটি সচেতনভাবে বা অবহেলাবশত উল্লেখ করা হয়নি বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, তারেক রহমান প্রথমে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে পদাধিকারবলে বিমসটেকের চেয়ারপারসন। আমন্ত্রণলিপিতে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদের এই অনুপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য অবমাননাকর এবং ভারত সরকারের বিষয়টি আরও সংবেদনশীলভাবে অনুধাবন করা উচিত ছিল।

এমন এক কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেই গত রোববার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো একটি সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরসহ সরকারের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকটি মূলত সৌজন্যমূলক হলেও সেখানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বরফ গলানোর পাশাপাশি অত্যন্ত কঠোর কিছু বার্তা দিল্লির কাছে পৌঁছে দিয়েছে ঢাকা। বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধে আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দ্রুত বাংলাদেশের কাছে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতীয় কূটনীতিবিদদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক জুলাই বিপ্লবের অন্যতম শহিদ শরীফ ওসমান হাদির সন্দেহভাজন খুনিরা যাতে কোনোভাবেই ভারতে নিরাপদ আশ্রয় বা পলায়নের সুযোগ না পায় এবং তাদের যেন অবিলম্বে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানান, দুই দেশের পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে ভারতকে সবার আগে ইতিবাচক মানসিকতার পরিচয় দিতে হবে। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে বসে পতিত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা যেভাবে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচার করেছেন এবং ভারত সরকার তা নির্বিঘ্নে করতে দিয়েছে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের তীব্র অসন্তোষ ও প্রতিবাদের কথা হাইকমিশনারকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ আশা করে, একটি বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র হিসেবে ভারত ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনকারী কোনো অপতৎপরতাকে আর প্রশ্রয় দেবে না। বৈঠকের পর ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে দুই দেশের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, যেকোনো জটিল রাজনৈতিক বা দ্বিপক্ষীয় ইস্যু আলোচনার টেবিলে বসে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব। ভারতের সাধারণ মানুষ ও সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল, সম্মানজনক ও পারস্পরিক কল্যাণকর অংশীদারত্ব বজায় রাখতে আন্তরিক বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ব্রিকস সম্মেলনের নামে দিল্লি মূলত একটি সুকৌশল কূটনৈতিক ফাঁদ পেতেছিল। সার্কের বিকল্প হিসেবে বিমসটেককে সামনে এনে এবং ব্রিকস সম্মেলনের মোড়কে ঢাকাকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবেই এই আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছিল বলে মনে করেন বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম. শহীদুজ্জামান। তাঁর মতে, ভারত যতদিন পর্যন্ত তার বাস্তবসম্মত বাংলাদেশ নীতি ও আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না করছে, ততদিন পর্যন্ত দেশটির সঙ্গে অতি উৎসাহী সম্পর্ক বজায় রাখার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে, ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত অবস্থান নেওয়ার পর এখন তাদের মূল মনোযোগ নিবদ্ধ রয়েছে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ঐতিহাসিক অংশগ্রহণের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করার ওপর।