ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা পদে মোহসেন রেজায়ির নিয়োগ ও ইসরায়েলের শঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা পদে মোহসেন রেজায়ির নিয়োগ ও ইসরায়েলের শঙ্কা
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে চলমান তীব্র সংঘাত ও উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এক সুদূরপ্রসারী ও তাৎপর্যপূর্ণ রদবদল সম্পন্ন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বৈরিতা এবং আঞ্চলিক নানা সংকটের মুখে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনির দপ্তর দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নীতিনির্ধারণী পদে নতুন নেতৃত্বের নাম ঘোষণা করেছে। এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক নজর কেড়েছে এবং তেল আবিবের ঘুম কেড়ে নিয়েছে সাবেক যুদ্ধকালীন কমান্ডার ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মোহসেন রেজায়িকে দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি। গত রোববার এক আদেশের মাধ্যমে তাঁকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি বা প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এই সংস্থায় সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। ৭১ বছর বয়সী মোহসেন রেজায়ি অতীতে দীর্ঘ ১৬ বছর ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং ১৯৮০-এর দশকে ইরাক ও ইরানের মধ্যকার ভয়াবহ যুদ্ধের সময়ও তিনি বাহিনীটির কমান্ডার-ইন-চিফ ছিলেন। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কৌশলে এক নতুন ও কঠোর লাইনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
মোহসেন রেজায়ির এই নিয়োগের খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে যে মোহসেন রেজায়ি এবং সদ্য নিয়োগ পাওয়া আইআরজিসির নতুন কমান্ডার-ইন-চিফ আহমাদ ভাহিদি—উভয়ের বিরুদ্ধেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসে একটি ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে ভয়াবহ বোমা হামলায় ৮৫ জন মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে এই দুই শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি রয়েছে। ইসরায়েলি ভূখণ্ড ও আন্তর্জাতিক ইহুদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে অতীতে সংঘটিত বিভিন্ন নাশকতার নেপথ্যে এই নেতাদের হাত ছিল বলে দাবি করে তেল আবিব। ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে যে ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে ওয়ান্টেড ও অভিযুক্ত অপরাধীদের দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার মসনদে বসিয়ে পুরস্কৃত করছে। কট্টরপন্থী এই সামরিক কমান্ডারদের শীর্ষ পদে আসায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে এবং নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছে ইসরায়েল।
এদিকে জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহকারী অধ্যাপক সিনা আজোদি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন যে মোহসেন রেজায়ির মতো একজন অভিজ্ঞ ও কট্টরপন্থী নেতাকে ক্ষমতায় আনার অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বা ভবিষ্যৎ কোনো আলোচনায় তেহরান নিজেদের অবস্থান নমনীয় করবে না। বরং ওয়াশিংটনের অবিরাম চাপের মুখেও প্রতিরোধমূলক কৌশল ও সামরিক শক্তি বজায় রাখাই ইরানের বর্তমান প্রশাসনের প্রধান নীতি হতে যাচ্ছে। রেজায়ির বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থাকা তাঁর সুদৃঢ় কর্তৃত্বকে কাজে লাগিয়েই মূলত আইআরজিসির অভ্যন্তরীণ সংহতি আরও জোরালো করতে চাইছে তেহরান। ইরাক যুদ্ধোত্তরকালে রাজনীতি ও অর্থনীতির দিকে কিছুটা ঝোঁক থাকলেও এবং প্রেসিডেন্ট পদে একাধিকবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ব্যর্থ হলেও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সামরিক নীতিনির্ধারণে রেজায়ির প্রভাব বরাবরই অপরিসীম ছিল। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া একটি সাময়িক সমঝোতা স্মারক বা এমওইউর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন রেজায়ি। হরমুজ প্রণালির নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ওই চুক্তির শর্তগুলো শেষ পর্যন্ত কার্যকর হতে না দিয়েই মার্কিনরা চুক্তিটি ভেস্তে দেবে বলে যে ভবিষ্যৎবাণী তিনি করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে সেটাই সত্যি প্রমাণিত হয়েছিল। হরমুজ প্রণালির মতো অতি সংবেদনশীল জলপথে দ্বিতীয় কোনো করিডোর বা মার্কিন আধিপত্য বরদাশত করা হবে না বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আসছেন।
নিরাপত্তা পর্ষদের সচিবালয় সূত্রে প্রকাশ পাওয়া তথ্যানুযায়ী, মোহসেন রেজায়ির এই অন্তর্ভুক্তি কেবল একজন ব্যক্তির পরিবর্তন নয়, বরং যুদ্ধকালীন বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই করে ইরানের সামগ্রিক সামরিক ও কূটনৈতিক নীতিতে একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে ইরানের সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারক মহলের মধ্যে দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা দূর করে একটি একক ও অভিন্ন কাঠামোর আওতায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও বেশি গতিশীল করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন দেশটির নীতিনির্ধারকরা। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকারের সঙ্গে প্রাথমিক কিছু মতপার্থক্য ও কট্টরপন্থীদের বিরোধিতার গুঞ্জন উঠলেও শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ নেতার সুনির্দিষ্ট ইচ্ছাতেই এই নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলমান ভূরাজনৈতিক এই জটিল সমীকরণে মোহসেন রেজায়ির মতো কট্টরপন্থী ও অভিজ্ঞ কমান্ডারের হাতে দেশের শীর্ষ নিরাপত্তার চাবি চলে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ নীতি আরও বেশি আক্রমণাত্মক ও কঠোর রূপ নিতে চলেছে, যা আগামী দিনে এই অঞ্চলে নতুন কোনো বড়ো ধরনের সংঘাতের ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত