প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জীবন নদীর গতিপথ কখন কোন মোড় নেয়, তা আগে থেকে নির্ধারণ করা মানুষের সাধ্যে থাকে না। অভাব আর অনিশ্চয়তার চাদরে মোড়ানো পথ পেরিয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর গল্পগুলো সবসময়ই মানবমনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। বিনোদন জগতের চাকচিক্যময় পর্দার পেছনের অন্ধকার কোণ থেকে লড়াই করে উঠে আসার তেমনি এক অবিশ্বাস্য ও অনুপ্রেরণাদায়ক উপাখ্যানের নাম গুরমিত চৌধুরী। বর্তমান প্রজন্মের কাছে তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত সফল তারকা এবং কোটি টাকার বিলাসবহুল সম্পত্তির মালিক হলেও, তাঁর এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও কন্টকাকীর্ণ সংগ্রামের ইতিহাস। পকেটে একটি টাকাও ছিল না, মাথার ওপর ছিল না নিশ্চিত কোনো ছাদ—এমনকি একসময় যাঁর দৈনিক উপার্জনের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৬ রুপি বা বাংলাদেশি মুদ্রায় মোটে ৪৬ টাকার কাছাকাছি, আজ তিনিই কোটি কোটি টাকার সাম্রাজ্যের মুকুটহীন সম্রাট। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আর অদম্য জেদের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে এই ভারতীয় অভিনেতার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে, যা লাখো তরুণের বুক বেঁধে পথ চলার এক অনন্য পাথেয় হয়ে উঠেছে।
গুরমিত চৌধুরীর শৈশব ও কৈশোর কিংবা কর্মজীবনের প্রথম অধ্যায়টি মোটেও মসৃণ ছিল না। বিনোদন দুনিয়ায় নিজের নাম খোদাই করার আগে তাঁকে প্রতিটি পদক্ষেপে হোঁচট খেতে হয়েছে, সহ্য করতে হয়েছে চরম অর্থনৈতিক সংকট। জীবিকার তাগিদে যখন মুম্বাইয়ের পথে ঘাটে অনিশ্চয়তার সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন তিনি, তখন প্রতিদিনের আহার জোগানোও ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। সেই দিনগুলোতে তাঁর দিনে আয় ছিল নামমাত্র ৩৬ রুপি। যে বয়সে যুবকেরা নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বিভোর থাকে, সেই বয়সে গুরমিতকে লড়তে হয়েছিল পেটের টানে। তবে মনের কোণে থাকা অভিনয়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং নিজের প্রতি অবিচল বিশ্বাসের শক্তি তাঁকে কখনোই ভেঙে পড়তে দেয়নি। হাজারো অপমান, কষ্ট আর না পাওয়ার বেদনাকে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি নীরবে হেঁটে গেছেন নিজের লক্ষ্যের দিকে। কোনো শর্টকাট বা ভাগ্যের জোরে নয়, বরং রক্ত-ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের মাধ্যমেই তিনি তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন তাঁর আজকের এই ঈর্ষণীয় অবস্থান, যা কেবল বিনোদন পাতার খবর নয়, বরং মানবিক সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল।

ছোটপর্দার হাত ধরেই মূলত গুরমিত চৌধুরীর অভিনয় জীবনের প্রকৃত উত্থান শুরু হয়েছিল। ভারতীয় টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম আইকনিক ও পৌরাণিক চরিত্র হিসেবে পরিচিত রামের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি রাতারাতি ভারতীয় উপমহাদেশের কোটি কোটি দর্শকের ড্রয়িংরুমে নিজের জায়গা করে নেন। রামায়ণ ধারাবাহিকে তাঁর সেই নিখুঁত অভিনয় আজও দর্শকদের হৃদয়ে অমর হয়ে আছে। শুধু পৌরাণিক চরিত্রই নয়, এর পাশাপাশি ‘গীত হুই সবসে পরায়ি’ কিংবা ‘পুনর্বিবাহ’-এর মতো জনপ্রিয় ও ব্যবসাসফল সব ধারাবাহিকে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করে তিনি আধুনিক রোমান্টিক নায়কের ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন। টেলিভিশন পর্দার গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর জনপ্রিয়তার পরিধি ছড়িয়ে পড়েছিল সুদূর কোণ পর্যন্ত। একের পর এক সুপারহিট মেগা সিরিয়ালে কাজ করার সুবাদে তিনি হয়ে ওঠেন ছোটপর্দার একচ্ছত্র অধিপতি। অভিনয়ের পাশাপাশি নৃত্যের মঞ্চেও নিজের প্রতিভার দ্যুতি ছড়িয়েছেন গুরমিত। ভারতের অত্যন্ত জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘ঝলক দিখলা যা’-এর মঞ্চে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি কেবল বিচারকদের মনই জয় করেননি, বরং চ্যাম্পিয়নের মুকুট ছিনিয়ে নিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে তিনি কেবল একজন সাধারণ অভিনেতা নন, বরং বহুমুখী প্রতিভার এক পরিপূর্ণ শিল্পী।
টেলিভিশনের আকাশচুম্বী সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে গুরমিত চৌধুরীর পা রেখেছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের মূল স্রোত বলিউডে। সিলভার স্ক্রিনেও নিজের উপস্থিতি জানান দিতে খুব বেশি সময় নেননি তিনি। ‘খামোশিয়াঁ’, ‘মিস্টার এক্স’ এবং ‘ওয়াজাহ্ তুম হো’-এর মতো ভিন্নধর্মী ও উত্তেজনাকর সিনেমাগুলোতে অভিনয় করে তিনি বড়পর্দায় নিজের অভিনয় দক্ষতার নতুন পরিচয় দেন। যদিও টেলিভিশন তারকাদের জন্য বলিউডে থিতু হওয়া সবসময়ই বেশ কঠিন হয়ে থাকে, তবুও গুরমিত তাঁর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও সাবলীল অভিনয়ের সুবাদে সেখানেও নিজের একটি স্থায়ী দর্শকশ্রেণি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। পেশাগত জীবনের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তিনি যেমন অর্জন করেছেন বিপুল খ্যাতি, তেমনি অর্জন করেছেন অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। যে মানুষটার একসময়ে পকেট শূন্য থাকত এবং সামান্য কয়েকটি মুদ্রার জন্য হিমশিম খেতে হতো, আজ তিনি প্রায় ২১ কোটি টাকার সুবিশাল বিলাসবহুল বাড়ির গর্বিত মালিক। জানা গেছে, তাঁর বর্তমান বাসস্থানটির একার মূল্যই প্রায় ১৬ কোটি রুপি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২০ কোটি ৭৩ লক্ষ টাকারও বেশি। শুধু এই বিশাল প্রাসাদোপম বাড়িটিই নয়, তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আরও অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী। নিজের মনের মতো করে একটি সুদৃশ্য ও প্রকৃতির কাছাকাছি ফার্মহাউস তৈরিরও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।

ব্যক্তিগত জীবনেও গুরমিত অত্যন্ত সৌভাগ্যবান ও সুখী একজন মানুষ। সহকর্মী ও অভিনেত্রী দেবিনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবন আজ এক সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। জীবনের কঠিনতম দিনগুলোতে দেবিনাকে পাশে পাওয়ার এবং পরবর্তীতে একসঙ্গে সুখ-দুঃখের দিনগুলো পার করার অসংখ্য মিষ্টি মুহূর্ত তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুরাগীদের সঙ্গে ভাগ করে নেন। স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে গুরমিতের বর্তমান সংসার জীবন অত্যন্ত গোছানো ও আনন্দমুখর। একসময়ের সেই অভাবের তাড়নায় জর্জরিত তরুণটি আজ পরম সুখের চাদরে মুড়ে কাটিয়ে দিচ্ছেন তাঁর সোনালী সময়। গুরমিত চৌধুরীর এই উত্থানের রূপকথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের বর্তমান অবস্থা যতই করুণ বা অন্ধকারাচ্ছন্ন হোক না কেন, সততা, ধৈর্য এবং কঠোর পরিশ্রমের হাত ধরে একদিন জীবনের মোড় ঘুরে যেতেই পারে। অনিশ্চয়তা আর সংগ্রামকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকার এই অবিশ্বাস্য জীবনসংগ্রাম আগামী দিনেও পৃথিবীর বহু মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে এবং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সাহস জোগাবে।