কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরা শুরু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার
কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরা শুরু
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ তিন মাস পনেরো দিন বা সাড়ে তিন মাসের দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা পেরিয়ে অবশেষে দেশের সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলাধার হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিত পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির ঐতিহাসিক কাপ্তাই হ্রদে পুনরায় শুরু হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত মাছ আহরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সরবরাহ এবং দেশব্যাপী বাজারজাতকরণের পুরো কার্যক্রম। গত সোমবার গভীর রাতে মধ্যরাত থেকেই হ্রদের তীরবর্তী এলাকার হাজার হাজার জেলে ও মৎস্যজীবী তাদের ছোট-বড় নৌকা নিয়ে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে হ্রদের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েন, যার ফলে রাঙ্গামাটির প্রধান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বা বিএফডিসি’র ল্যান্ডিং ঘাটে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মৎস্য ব্যবসায়ী, আড়তদার, বরফ কলমালিক এবং সাধারণ জেলেদের মাঝে এক অভূতপূর্ব প্রাণচাঞ্চল্য ও উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। হ্রদে মাছ ধরা পুনরায় উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় বন্ধ থাকা স্থানীয় বরফ কলগুলোও তাদের উৎপাদন কার্যক্রম পুরোদমে চালু করেছে এবং এর ফলশ্রুতিতে আজ মঙ্গলবার সকাল থেকেই রাঙ্গামাটির নির্ধারিত চারটি গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডিং ঘাটে নানা প্রজাতির প্রচুর মাছ এসে পৌঁছাতে শুরু করেছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে নতুন গতিশীলতা দান করেছে।
রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের অত্যন্ত কঠোর নির্দেশে এবং মৎস্য খাতের সুরক্ষার স্বার্থে গত ২৪ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জলে কার্প জাতীয় মাছের নিরাপদ প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করা, পোনা মাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটানো এবং সামগ্রिकভাবে কাপ্তাই হ্রদের সমগ্র প্রাকৃতিক পরিবেশকে মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধির উপযোগী ও টেকসই হিসেবে গড়ে তোলার এক সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। সেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হ্রদে মাছের বংশবিস্তার নিরবচ্ছিন্ন রাখতে টানা সাড়ে তিন মাস ধরে সব ধরনের মাছ শিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রাখা হয়েছিল। নির্ধারিত সেই মেয়াদ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর প্রশাসনের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী গত সোমবার মধ্যরাত থেকে হ্রদে মাছ শিকারের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় এবং মৎস্যজীবীদের জন্য হ্রদ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর পরই জেলেরা গভীর রাতে আনন্দে বুক বেঁধে কাপ্তাই হ্রদের বুকে পাড়ি জমান এবং ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ শিকার করে ঘাটে ফিরে আসতে শুরু করেন।
দীর্ঘ তিন মাস পনেরো দিন ধরে হ্রদে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় রাঙ্গামাটির স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী ও এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত লাখ লাখ মানুষের জীবনযাত্রায় একধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছিল। তবে নিষেধাজ্ঞা কেটে যাওয়ায় তাদের মুখে এখন স্বস্তির হাসি ফুটে উঠেছে। রাঙ্গামাটি মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সম্মানিত সাধারণ সম্পাদক আব্দুল শুক্কুর সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানান যে, সুদীর্ঘ সাড়ে তিন মাস পর কাপ্তাই হ্রদে পুনরায় মাছ আহরণ শুরু হতে পেরে তাঁরা মৎস্য ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সকল ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও জেলে সমাজ অত্যন্ত আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে, প্রথম দিকে জালে ধরা পড়া মাছের আকার বা সাইজ কিছুটা ছোট দেখা গেলেও আর মাত্র কদিনের মধ্যেই বোঝা যাবে কী ধরনের মাছ ধরা পড়ছে এবং মাছের সাইজ যদি সন্তোষজনক হয়, তবে ব্যবসায়ীরা দারুণ লাভের মুখ দেখতে পারবেন। পাহাড়ি এই জনপদের মানুষের জীবন-জীবিকা বহুলাংশে এই হ্রদের মাছের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রমে নতুন আশার আলো জ্বেলে দিয়েছে।
রাঙ্গামাটি বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন বা বিএফডিসি’র সুযোগ্য ব্যবস্থাপক কমান্ডার মো. ফয়েজ আল করিম অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক কণ্ঠে জানিয়েছেন যে, কাপ্তাই হ্রদে টানা তিন মাস মাছ শিকার বন্ধ রাখার ইতিবাচক সুফল হিসেবে মাছ আহরণ শুরু হওয়ার প্রথম দিনেই রাঙ্গামাটির বিএফডিসির প্রধান ল্যান্ডিং ঘাটে প্রচুর পরিমাণে তাজা মাছের আগমন ঘটেছে। বর্তমান সময়ে জালে ওঠা মাছের আকার কিছুটা ছোট মনে হলেও তিনি দৃঢ় আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী কিছুদিনের মধ্যে হ্রদের গভীরে থাকা মাছগুলোর আকার আরও বড় হবে এবং ক্রেতারা পছন্দসই মাছ লাভ করতে পারবেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কাপ্তাই হ্রদে মাছের সুষ্ঠু প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করার ফলেই এ বছর মাছের বংশবিস্তার অত্যন্ত সন্তোষজনক হয়েছে এবং এর ফলে সামনের দিনগুলোতে কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য উৎপাদনের পূর্বের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে একটি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবে বলে তাঁরা জোরালোভাবে আশা করছেন।
কাপ্তাই হ্রদের সুবৃহৎ এই জলরাশি এবং এর প্রাকৃতিক সম্পদ কেবল রাঙ্গামাটির স্থানীয় অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করছে না, বরং পাহাড়ের বিপুল সংখ্যক দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার প্রধান উৎস হিসেবে সরাসরি যুক্ত রয়েছে। এই কারণে প্রতিবছর নির্দিষ্ট একটি সময় ধরে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হ্রদে মাছ আহরণ বন্ধ রাখা হয়, যাতে জলজ প্রাণীরা নিরাপদে প্রজননের পূর্ণ সুযোগ পায় এবং পরবর্তীতে নির্দিষ্ট ও কঠোর নিয়মকানুন মেনে মাছ শিকার উন্মুক্ত করার মাধ্যমে মৎস্য সম্পদকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসইভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয়। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই দূরদর্শী ব্যবস্থাপনার ফলস্বরূপ কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য সম্পদ দিন দিন আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে। সুদীর্ঘ সাড়ে তিন মাসের অপেক্ষার পালা শেষ করে কাপ্তাই হ্রদের বুকে পুনরায় মৎস্য আহরণের এই কর্মযজ্ঞ শুরু হওয়ায় রাঙ্গামাটিসহ সমগ্র অঞ্চলের চারটি প্রধান মৎস্য অবতরণ ঘাট এবং এর আশপাশের বাজারগুলো আবার প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছে, যা পুরো পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতিতে এক দারুণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে চলেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত