প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কর্পোরেট দুনিয়ায় এক বিশাল আইনি নাটক ও দীর্ঘ টালবাহানার অবসান ঘটিয়ে ভারতের অন্যতম শীর্ষ শিল্পপতি এবং গৌতম আদানির বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দায়েরকৃত আলোচিত জালিয়াতি ও ঘুষের মামলা আনুষ্ঠানিকভাবে খারিজ করে দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ প্রত্যাহারের আবেদনের প্রেক্ষিতে স্থানীয় সময় সোমবার মার্কিন আদালত এই ঐতিহাসিক ও চাঞ্চল্যকর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং আদালতের সংরক্ষিত নথিপত্র থেকে জানা গেছে যে, গত মে মাসেই ফেডারেল প্রসিকিউটররা এই মামলাটি খারিজ করার জন্য আদালতের কাছে সুনির্দিষ্ট আবেদন করেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় ব্রুকলিনের ফেডারেল বিচারক নিকোলাস গারাউফিস সোমবার সেই অনুরোধে চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক সিলমোহর দেন, যার ফলে আইনি ঝামেলার এই বিশাল বোঝা থেকে আপাতত সম্পূর্ণ দায়মুক্তি পেলেন ভারতীয় এই প্রভাবশালী ধনকুবের।

উল্লেখ্য, বিগত ২০২৪ সালে ভারতীয় শিল্পপতি গৌতম আদানির বিরুদ্ধে মার্কিন বিচার বিভাগ ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুতর কিছু অভিযোগ আনা হয়েছিল। সে সময়কার অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছিল যে, অত্যন্ত লাভজনক সৌর বিদ্যুৎ সরবরাহের সরকারি চুক্তি নিজেদের কব্জায় নেওয়ার জন্য ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করতে এবং তাদের ঘুষ দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রায় ২৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিশাল আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন গৌতম আদানি। এই আন্তর্জাতিক সৌর শক্তি খাতের প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বহু আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে ঘুষ ও জালিয়াতির এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্বজুড়ে আদানি গ্রুপের ব্যবসায়িক সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয় এবং আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে তাদের শেয়ারের দামে বড় ধরনের ধস নামে। বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম আলোচিত এই কর্পোরেট কেলেঙ্কারির বিচার মার্কিন মাটিতে শুরু হওয়ায় তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক মহলে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছিল।
মামলার আইনি কার্যক্রমে নাটকীয় মোড় নেওয়ার পেছনে বিশিষ্ট আইনজীবী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা নিয়েও গণমাধ্যমে নানা জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছিল। জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই জটিল বিচার প্রক্রিয়ায় গৌতম আদানির পক্ষে প্রধান আইনজীবী হিসেবে আইনি লড়েছিলেন স্বনামধন্য আইনি বিশেষজ্ঞ রবার্ট জিউফ্রা, যিনি বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবী হিসেবেও অত্যন্ত পরিচিত। বিশ্বস্ত সূত্রে প্রকাশ পেয়েছিল যে, মামলাটি চলমান থাকা অবস্থায় গত এপ্রিল মাসে আইনজীবী রবার্ট জিউফ্রা মার্কিন বিচার বিভাগের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিশেষ আলোচনায় বসেছিলেন। সেই আলোচনায় তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে, যদি মার্কিন প্রশাসন আদানির বিরুদ্ধে আনীত এই মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া প্রত্যাহার করে নেয়, তবে এই ভারতীয় শিল্পপতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ভবিষ্যতে দশ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছেন। বিশাল অঙ্কের এই বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে মার্কিন সরকার কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপের মুখে মামলা প্রত্যাহার করছে কি না, তা নিয়ে শুরুতে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন মামলার দায়িত্বে থাকা বিচারক নিজেও। তবে দীর্ঘ আইনি যাচাই-বাছাই ও নথিপত্র পর্যালোচনার পর বিচারক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এই প্রত্যাহার প্রক্রিয়া বিচারিক বা প্রসিকিউশনের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোর বাইরে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক প্রভাবের ফল ছিল না।

মার্কিন আদালতের পক্ষ থেকে মামলা খারিজ করার এই চূড়ান্ত ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ভারতের অন্যতম শীর্ষ ধনী ও প্রভাবশালী এই শিল্পপতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ভেরিফাইড অ্যাকাউন্টে গৌতম আদানি এক প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন যে, তিনি মার্কিন আদালতের এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে স্বাগত জানাচ্ছেন এবং একই সঙ্গে পুরো বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি নিজের বিনয় ও গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছেন। আদানি আরও উল্লেখ করেছেন যে, বিগত এই কঠিন ও সংকটময় সময়েও সত্য, ন্যায়বিচার এবং মার্কিন আইনের শাসন ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর পরিবারের এবং পুরো করপোরেট গ্রুপের অটুট ও অবিচল বিশ্বাস বজায় ছিল। আদানি গ্রুপ ভারতের অন্যতম বৃহত্তম এবং সর্ববৃহৎ বহুমুখী ব্যবসায়িক গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। দেশের সমুদ্রবন্দর পরিচালনা, বিশাল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন থেকে শুরু করে আধুনিক সিমেন্ট কারখানা এবং প্রভাবশালী গণমাধ্যম বা মিডিয়া সেক্টরসহ দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতেই তাদের বিশাল ব্যবসা ও বিনিয়োগ রয়েছে। সাম্প্রতিক বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন ধরনের করপোরেট জালিয়াতির অভিযোগ, শর্ট-সেলারদের আক্রমণ এবং আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে ধসের কারণে বড় ধরনের ধাক্কা খেলেও, এই মামলা খারিজ হওয়ার ঘটনাটি তাদের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যকে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর বড় একটি আইনি স্বস্তি এনে দিল। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বাণিজ্যের ময়দানে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত গৌতম আদানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একজন প্রকাশ্য ও একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবেও সুপরিচিত, যা এই পুরো আইনি লড়াইয়ের রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও বেশি দৃশ্যমান করে তুলেছিল।