প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মর্মান্তিক একটি ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত মাগুরার আট বছরের নিষ্পাপ শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও নির্মম হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স এবং এর বিপরীতে দায়ের করা আপিলগুলোর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক শুনানি শুরু হয়েছে। দেশের উচ্চ আদালতের একটি বিশেষ বেঞ্চে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথ আরও একধাপ এগিয়ে গেল। মঙ্গলবার উচ্চ আদালতের বিচারিক কার্যক্রমে এই বহুল আলোচিত মামলার শুনানি শুরু হয়, যা দেশের পুরো বিচার অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিচারপ্রার্থী পরিবার ও দেশবাসীর একটাই প্রত্যাশা, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত একমাত্র অপরাধীর সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হবে, যা সমাজে এ ধরনের নৃশংস অপরাধের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করবে।
হাইকোর্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, আজ মান্যবর বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী এবং বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে গঠিত একটি বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চে এই মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে আইনি লড়াই পরিচালনা ও যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন বিজ্ঞ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. ইমাম হোসেন তারেক। এ সময় তাঁর সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আইনি সহায়তার জন্য আরও উপস্থিত ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল রোহানী সিদ্দীকা এবং মাহবুবা তাসনিম আঁখি। শিশু আছিয়া হত্যা মামলার যাবতীয় নথি, সাক্ষ্যপ্রমাণ, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং বিচারিক আদালতের রায়ের কপি পর্যালোচনা করে উচ্চ আদালত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ঘটনার ভয়াবহতা ও অপরাধের মাত্রা তুলে ধরে উচ্চ আদালতে জোরালো সওয়াল পেশ করছেন, যাতে ন্যায়বিচার কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়।

মামলার বিবরণে জানা যায়, এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিগত ২০২৫ সালের ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক এম জাহিদ হাসান এক যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেছিলেন। সেই রায়ে শিশু আছিয়ার ওপর চালিত নৃশংস শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ ও পরবর্তীতে হত্যার প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে শিশুটির নিজের বোনের শ্বশুর হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল। বিচারিক আদালতের রায়ে মামলার বাকি তিন অভিযুক্ত আসামি অর্থাৎ শিশুটির বোনের জামাতা সজীব শেখ, সজীবের ভাই রাতুল শেখ এবং তাদের মা জাহেদা বেগমকে বিভিন্ন কারণে অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল থেকে এই চাঞ্চল্যকর মামলার যাবতীয় ডেথ রেফারেন্স ও নথিপত্র উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়, যার ওপর ভিত্তি করে বর্তমান এই আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানি শুরু হলো।
ঘটনার মর্মান্তিক পটভূমি বিবেচনা করলে আজও শিহরিত হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের মন। বিগত ২০২৫ সালের মার্চ মাসের শুরুর দিকে মাগুরার নিজনান্দুয়ালী গ্রামে নিজের বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল আট বছরের ছোট্ট শিশু আছিয়া। কিন্তু পরিচিত সেই আশ্রিত পরিবেশেই সে একদল নরপশুর লালসার শিকার হয় এবং অত্যন্ত অমানবিক যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের নির্মমতার মুখোমুখি হয়। গুরুতর আহত ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় প্রথমে তাকে মাগুরা সদর হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এনে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে জীবন রক্ষার্থে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে অত্যন্ত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে সে বছরেরই ১৩ মার্চ ঢাকা সিএমএইচের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে নিষ্পাপ শিশু আছিয়া।

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে এবং বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার লক্ষ্যে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ও বিচার বিভাগের দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে প্রধান বিচারপতি গত ২০২৬ সালের ১০ জুন নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাগুলোর মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন বা ডেথ রেফারেন্স এবং আপিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির জন্য একটি বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠন করে দেন। এই বিশেষ বেঞ্চে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মামলা পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ শক্তিশালী লিগ্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে গঠিত এই আইনি টিমের সদস্যরা দেশের এই অতি সংবেদনশীল মামলাগুলো অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালনা করে আসছেন। শিশু আছিয়া হত্যা মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং সঠিক বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশজুড়ে শিশু নির্যাতন ও অপরাধের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে বলেই মনে করছেন দেশের বিশিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা।