প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আগামী ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা ও কর্মতৎপরতা তুঙ্গে। দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির জন্য আগামী ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর একটি সতর্কবার্তা প্রদান করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, জাতীয় সংসদের সদস্যগণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে নিজেদের দলের মনোনীত প্রার্থীর বাইরে অন্য কাউকে ভোট দিতে পারবেন না। চিফ হুইপের ভাষ্যমতে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বর্তমানে পূর্ণমাত্রায় কার্যকর রয়েছে এবং এই অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য যদি দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভিন্ন কোনো প্রার্থীকে ভোট প্রদান করেন, তবে তাঁর সংসদ সদস্য পদটি বাতিল বলে গণ্য হবে। জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম এই সাংবিধানিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন, যা নির্বাচনপূর্ব এই রাজনৈতিক মুহূর্তে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন মূলত সংসদ সদস্যদের গোপন ব্যালটের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়ে থাকে। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানান যে, আগামী ২০ আগস্ট বুধবার সংসদ ভবনের মূল অধিবেশন কক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে। সংসদ সদস্যরা তাদের আসন ও বিভক্তিসংখ্যা অনুযায়ী এই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের মতো রাষ্ট্রীয় শীর্ষ ব্যক্তিবর্গের ভোট প্রদানের মুহূর্তগুলো সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ভোট গণনা থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিই জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং সরাসরি সম্প্রচারিত হবে, যাতে স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়ার সুযোগ না থাকে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও আলোচনা রয়েছে। চিফ হুইপ যে বিষয়টি সামনে এনেছেন, তা মূলত একজন সংসদ সদস্যের দলীয় আনুগত্য ও স্বাধীন ভোটাধিকারের মধ্যকার সূক্ষ্ম রেখাকে নির্দেশ করে। সংবিধানের উক্ত অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, কোনো সংসদ সদস্য যদি তাঁর দলের বিপক্ষে ভোট প্রদান করেন বা দলত্যাগ করেন, তবে তাঁর সংসদীয় আসনটি শূন্য হয়ে যাবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রয়োগের বিষয়টি নিয়ে আইনজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে অত্যন্ত কঠোরভাবে দেখার আভাস দেওয়া হয়েছে। এটি পরিষ্কার যে, আসন্ন নির্বাচনটি কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি দলের প্রতি সদস্যদের আনুগত্য প্রমাণের একটি পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এ নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও সরকারি দলের অবস্থান বর্তমানে অটল।
বিএনপির প্রার্থী এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে নানা কৌতূহল কাজ করছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। চিফ হুইপ নূরুল ইসলামকে বিএনপির প্রার্থী কবে চূড়ান্ত হবে সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান যে, প্রধানমন্ত্রী নিজেই উপযুক্ত সময়ে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন এবং মনোনয়ন পত্র জমার নির্ধারিত তারিখের আগেই তা সর্বসাধারণের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। এই প্রার্থী চূড়ান্ত করার মাধ্যমে বিরোধী জোট তাদের রাজনৈতিক অবস্থান জানান দিতে চাচ্ছে। এদিকে বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই পদে লড়তে পারেন। সব মিলিয়ে নির্বাচনে একদিকে সরকারি দলের শক্ত অবস্থান এবং অন্যদিকে বিরোধী জোটের অংশগ্রহণ নির্বাচনটিকে বেশ জমজমাট করে তুলেছে।
নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও অর্থবহ করে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি সংবাদ সম্মেলনে মতপ্রকাশ করেন যে, রাষ্ট্রপতির মতো একটি মহান ও গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য একটি সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হওয়া উচিত। তিনি মনে করেন যে, যদি ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করে ভোটাধিকারের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা আনা যেত, তবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সাধারণ মানুষের কাছে আরও অধিক সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতেন। তবে সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা নির্বাচনটিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করার লক্ষ্যে তাদের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে মাঠে রেখেছেন। জুলাই সনদের আলোকে রাজনৈতিক সংস্কারের যে দাবি উঠেছে, তার প্রতিফলন যেন এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় দেখা যায়, সেই প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পূর্বপ্রস্তুতিমূলক সভায় জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল সভাপতিত্ব করেন। উক্ত সভায় চিফ হুইপ, বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ এবং সংশ্লিষ্ট হুইপবৃন্দসহ সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিবগণ উপস্থিত ছিলেন। সভায় নির্বাচনের জন্য সংসদ ভবনের পরিবেশ রক্ষা, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং সংসদ সদস্যদের নিরাপত্তা ও উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের তত্ত্বাবধানে ও পরিচালনায় এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রীসহ সকল সংসদ সদস্য ভোটার হিসেবে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতির নির্বাচনে সব ধরনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয় একে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হিসেবে সম্পন্ন করার জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।