প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন উত্তপ্ত সংসদ ভবন এবং ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া ছাত্র আন্দোলনের দাবানল। দিল্লিতে শিক্ষার্থী বিক্ষোভ দমনের অভিযোগে কেন্দ্রীয় শাসকদল বিজেপি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যখন রাজনৈতিক কোণঠাসার মুখে, ঠিক তখনই ঝাড়খণ্ডে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি লাঠিচার্জের ঘটনা বিজেপিকে এক নতুন কৌশল অবলম্বনের সুযোগ করে দিয়েছে। দিল্লিতে শিক্ষার্থী আন্দোলনের জেরে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা চাওয়া এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহির দাবিতে বিরোধীরা গত তিন সপ্তাহ ধরে সংসদ অচল করে রেখেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে রাঁচিতে পুলিশের দমন-পীড়নের ঘটনাকে হাতিয়ার করে বিজেপি এখন পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। সংসদ চত্বরে এখন সরকারপক্ষ ও বিরোধীদের পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ ও স্লোগানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংঘাত।
গত তিন সপ্তাহ ধরে ভারতের সংসদের উভয় কক্ষেই অচলাবস্থা বিরাজ করছে। বিরোধীদের প্রধান দাবি হলো, দিল্লিতে শিক্ষার্থী আন্দোলনের সময় পেলেট গান, কাঁদানে গ্যাস এবং ইলেকট্রিক শক ব্যাটন ব্যবহারের নির্দেশ কে দিয়েছিল, তা স্পষ্ট করতে হবে। বিরোধীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ বা জবাবদিহি চাইছেন। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সংসদের অধিবেশন কক্ষে অনুপস্থিতি বিরোধীদের ক্ষোভকে আরও তীব্র করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, টানা তিন সপ্তাহ ধরে সংসদের মুখোমুখি না হওয়া সরকারের এক বিরল ও বিতর্কিত নজির হিসেবে ইতিহাসে থেকে যাবে। তবে ঝাড়খণ্ডের ঘটনা বিজেপিকে যেন এক নতুন প্রাণশক্তি দিয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ঝাড়খণ্ডের সরকার বা পুলিশি ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হওয়া সত্ত্বেও বিজেপি এখন ঝাড়খণ্ডের ঘটনার দায়ভার তাঁর ওপর চাপিয়ে ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে সরব হয়েছে।

ঝাড়খণ্ডের রাজধানী রাঁচিতে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন। সোমবার বিধানসভা অভিযানের সময় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর ঝাড়খণ্ডের পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে এবং লাঠিপেটা করে। এই ঘটনায় অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন, যা সারা দেশে নিন্দার ঝড় তুলেছে। ঝাড়খণ্ডে কংগ্রেস, আরজেডি ও বামপন্থীদের সমর্থনে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম)-এর সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। আর এই সুযোগটিকেই কাজে লাগাচ্ছে বিজেপি। তাদের দাবি, রাহুল গান্ধী যেহেতু ইন্ডিয়া জোটের নেতা, তাই এই পুলিশি নির্যাতনের দায় তাঁকে নিতে হবে। সংসদ চত্বরে বিজেপি ও এনডিএ জোটের সংসদ সদস্যরা প্ল্যাকার্ড হাতে রাহুলের ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন, যা সংসদীয় রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের সৃষ্টি করেছে।
রাহুল গান্ধী অবশ্য ঝাড়খণ্ডের ঘটনার প্রেক্ষিতে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে পুলিশি বলপ্রয়োগের নিন্দা জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার রয়েছে। তাঁর মতে, আলোচনার মাধ্যমেই কেবল সমস্যার সমাধান সম্ভব। রাহুল কেন্দ্রীয় সরকার, ঝাড়খণ্ড সরকার এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন যে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও নিপীড়নমূলক। তিনি শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার আনার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বিজেপির আক্রমণ এতে থামেনি। তারা প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদেরাকে সংসদ প্রাঙ্গণে ঘিরে ধরে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেছে যে, কেন রাহুল গান্ধী এ বিষয়ে নীরব। প্রিয়াঙ্কা পাল্টা জবাব দিয়েছেন যে, রাহুল আগেই এই বর্বরতার নিন্দা জানিয়েছেন এবং ঝাড়খণ্ডের শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন।
এদিকে ঝাড়খণ্ডের আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র মাহাতো দশ দিন ধরে অনশন করার পর বর্তমানে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। অ্যাম্বুলেন্সে করে বিধানসভা অভিযানে যোগ দেওয়া এই তরুণ নেতার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি দেবেন্দ্র মাহাতোকে ‘প্রকৃত বীর’ আখ্যা দিয়ে পুলিশি নিষ্ঠুরতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ঝাড়খণ্ড সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, শিক্ষার্থীদের ৯৮ শতাংশ দাবি ইতিমধ্যেই মেনে নেওয়া হয়েছে। তবে সিবিআই তদন্তের দাবি এবং নিয়োগ পরীক্ষার বাতিল সংক্রান্ত যে দুটি দাবি শিক্ষার্থীরা উত্থাপন করেছেন, তা নিয়ে সরকার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। রাজ্য বিজেপি এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং শিক্ষার্থীদের সমর্থনে ধর্মঘটের ডাক দিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দিল্লির ঘটনা এবং ঝাড়খণ্ডের ঘটনার মধ্যে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। তারা একদিকে নিজেদের ওপর ওঠা দমন-পীড়নের অভিযোগ থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে চাইছে, অন্যদিকে বিরোধীদের নৈতিক অবস্থানে চিড় ধরাতে রাহুল গান্ধীকে আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। সংসদীয় অধিবেশনের শেষ দিন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই পাল্টাপাল্টি চাপের রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা দেখার জন্য এখন সারাদেশ তাকিয়ে আছে। সংসদ ভবন চত্বরের এই অস্থিরতা কেবল কোনো নির্দিষ্ট ইস্যুর সীমাবদ্ধতা নয়, বরং ভারতের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর সংকটের প্রতিফলন। উভয় পক্ষই যখন অনড় অবস্থানে রয়েছে, তখন গণতান্ত্রিক আলোচনার পথ কতটা খোলা থাকবে, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে জনমনে।