প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানবদেহের অন্যতম প্রধান ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ হলো কিডনি, যা প্রতিটি মানুষের সার্বিক সুস্থতা রক্ষায় নীরবে এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রতিদিন অগণিত কাজ করে চলেছে। আমাদের শরীর থেকে বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়া সমস্ত বর্জ্য ও দূষিত পদার্থ ফিল্টারের মাধ্যমে প্রস্রাবের সঙ্গে সফলভাবে বের করে দেওয়া, শরীরের রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ রাখা, রক্তে পানির ভারসাম্য নিখুঁতভাবে রক্ষা করা এবং নতুন রক্তকণিকা উৎপাদনে সহায়তা করার মতো বহু জটিল শারীরিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালনা করে থাকে এই কিডনি। অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এই অঙ্গটির রোগবালাই ও অসুস্থতাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা প্রায়শই অত্যন্ত ভয়ংকর এক ‘সাইলেন্ট কিলার’ বা নীরব ঘাতক হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। এর মূল কারণ হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিডনির কার্যক্ষমতা সত্তর থেকে আশি শতাংশের বেশি নষ্ট বা অকেজো না হওয়া পর্যন্ত সাধারণত বাইরে থেকে এর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ বা উপসর্গ প্রকাশ পায় না। এ কারণেই জীবনের শুরু থেকেই, বিশেষ করে অল্প বয়স থেকেই নিজেদের কিডনি সুস্থ ও সচল রাখার বিষয়ে সর্বোচ্চ সচেতন হওয়া এবং একটি স্বাস্থ্যকর জীবনধারা নিয়মিত মেনে চলা প্রতিটি মানুষের জন্যই অত্যন্ত জরুরি ও অপরিহার্য একটি কর্তব্য।
প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এর একটি বিশেষ স্বাস্থ্য প্রতিবেদনে কিডনি সুরক্ষার সাতটি অত্যন্ত কার্যকরী ও দারুণ নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মেনে চলা অত্যন্ত প্রয়োজন। এর মধ্যে সবার প্রথমে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পানের সুঅভ্যাস গড়ে তোলা। কিডনি সুস্থ রাখার সবচেয়ে সহজলভ্য, স্বাভাবিক ও কার্যকর উপায় হলো প্রতিদিন নিয়মিতভাবে পর্যাপ্ত পানি পান করা। একজন সুস্থ ও পূর্ণবয়স্ক মানুষের দিনে অন্তত আড়াই থেকে তিন লিটার পানি পান করা উচিত, যা শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক গতিশীলতা বজায় রাখে। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করলে কিডনি অত্যন্ত সহজে এবং কোনো ধরনের বাড়তি চাপ ছাড়াই রক্ত থেকে সোডিয়াম, ইউরিয়া ও অন্যান্য ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে দক্ষতার সঙ্গে শরীর থেকে বের করে দিতে সক্ষম হয়। এর পাশাপাশি, পর্যাপ্ত পানি শরীরে পানির সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখার মাধ্যমে কিডনিতে পাথর বা স্টোন হওয়ার ঝুঁকিও অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।

কিডনি সুরক্ষার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নিয়মটি হলো বিনা কারণে বা সামান্য কারণেই যত্রতত্র ব্যথানাশক ওষুধ বা শক্তিশালী পেইনকিলার সেবনের বদভ্যাস পুরোপুরি এড়িয়ে চলা। আমাদের সমাজে অনেকেই সামান্য মাথা ব্যথা, শারীরিক ক্লান্তি, গা-হাত পা ব্যথা বা সামান্য জ্বর অনুভূত হলেই চিকিৎসকের কোনো ধরনের পরামর্শ বা প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ফার্মেসি থেকে ইচ্ছেমতো ব্যথানাশক ওষুধ কিনে সেবন করেন, যা আদতে স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অল্প বয়স থেকে অতিরিক্ত এবং সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে এই ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ সেবন করলে তা সরাসরি আমাদের কিডনির ভেতরে থাকা সূক্ষ্ম ফিল্টার টিস্যুগুলোকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয় এবং কিডনি বিকল হওয়ার পথ প্রশস্ত করে। এর পরিবর্তে প্রাকৃতিক উপায়ে শারীরিক কষ্ট নিরাময়ের চেষ্টা করা এবং চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের শক্তিশালী ওষুধ সেবন থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা উচিত।
তৃণমূল পর্যায় থেকে কিডনিকে সুরক্ষিত রাখতে হলে রক্তচাপ এবং রক্তের শর্করা বা সুগারের মাত্রা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত আবশ্যক। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, উচ্চ রক্তচাপ এবং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস হলো মানবদেহের কিডনি চিরতরে বিকল হয়ে যাওয়ার প্রধান দুটি কারণ। মানুষের রক্তের শর্করা ও রক্তচাপের মাত্রা যদি দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, তবে তা ধীরে ধীরে কিডনির ভেতরের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল রক্তনালীগুলোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য অল্প বয়স থেকেই নিয়মিত বিরতিতে, বিশেষ করে বছরে অন্তত একবার রক্তের সুগার ও উচ্চ রক্তচাপের মাত্রা মেপে দেখা এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী তা সুনির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। এর পাশাপাশি চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হিসেবে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা থেকে অতিরিক্ত কাঁচা লবণ ও লবণাক্ত খাবার গ্রহণের প্রবণতা কমানো উচিত। খাবারে অতিরিক্ত লবণ বা সোডিয়াম প্রবেশ করলে তা শরীরের রক্তচাপ দ্রুত বাড়িয়ে দেয় এবং কিডনির ওপর অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এ কারণে প্রক্রিয়াজাত খাবার, প্যাকেটজাত চিপস, বিভিন্ন ধরনের সসেজ, চানাচুর এবং রান্নার সময় পাতে অতিরিক্ত কাঁচা লবণ খাওয়া সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা উচিত।
পঞ্চম নিয়ম হিসেবে আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান এবং ধূমপানের মতো মারাত্মক ক্ষতিকর অভ্যাসগুলো চিরতরে বর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। ধূমপান এবং যেকোনো ধরনের তামাক সেবন শরীরের রক্তনালীগুলোকে সংকুচিত করে তোলে, যার ফলে কিডনির কার্যক্ষমতা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে হ্রাস পেতে শুরু করে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পরিমাণে অ্যালকোহল পান করলে তা কিডনির স্বাভাবিক ছাঁকন প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে এবং এর ফলে শরীরে মারাত্মক সব টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ জমে কিডনিকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ষষ্ঠ নিয়ম হিসেবে একটি সুষম আহার গ্রহণ এবং সঠিক শারীরিক ওজন বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা থেকে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত প্রোটিন, রিফাইন্ড বা পরিশোধিত চিনি এবং মিষ্টিজাতীয় কোমল পানীয় যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। এর বদলে পুষ্টিকর ও টাটকা শাকসবজি, ফলমূল এবং সহজে হজম হয় এমন স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করা উচিত। শরীরের অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে একাধারে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বহুলাংশে কমে যায়, যা পরোক্ষভাবে আমাদের শরীরের অমূল্য অঙ্গ কিডনিকে যেকোনো বড় ধরনের বিপদের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

সপ্তম ও সর্বশেষ নিয়ম হিসেবে দৈনন্দিন জীবনে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়ামকে অভ্যাসে পরিণত করার কথা বলা হয়েছে। প্রতিদিন অন্তত ত্রিশ মিনিট সময় বের করে নিয়মিত সাঁতার কাটা, হালকা জগিং করা, সাইকেল চালানো বা দ্রুত হাঁটার মতো স্বাস্থ্যকর অ্যারোবিক ব্যায়াম করা উচিত। নিয়মিত এই ধরনের শারীরিক পরিশ্রমের ফলে শরীরের পুরো রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে এবং এর হাত ধরেই শরীরের রক্তচাপ নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকে। পাশাপাশি, চিকিৎসকদের মতে, পরিবারে যদি আগে থেকেই কারও বংশগতভাবে কিডনির রোগ, ডায়াবেটিস কিংবা উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘস্থায়ী কোনো রোগের ইতিহাস থাকে, তবে বয়স পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছর পার হওয়ার পর থেকেই সচেতনতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বছরে অন্তত একবার নিয়মিতভাবে রক্তের ‘সিরম ক্রিয়েটিনিন’ এবং প্রস্রাবের ‘অ্যালবুমিন’ পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া অত্যন্ত বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মূলত একটু সচেতনতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই পারে আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে এবং কিডনি নামক এই অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গটিকে আজীবন সুরক্ষিত রাখতে।