প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলায় বিদ্যুৎ বিভাগের বকেয়া বিল আদায়ের একটি বিশেষ ঝটিকা অভিযান ঘিরে স্থানীয় জনমনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা বিপিডিবি অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং এর অংশ হিসেবে খোদ একটি জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনসহ মোট পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগ তাৎক্ষণিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। গত সোমবার দুপুরের দিকে কুলিয়ারচরের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সরাসরি নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে জমে থাকা দীর্ঘমেয়াদি বকেয়া বিল উদ্ধারের এই কড়া পদক্ষেপে পুরো এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে এবং জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো ঘটনাটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে নানা ধরনের আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীল সূত্র এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, কুলিয়ারচর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের নামে বিগত দুটি ভিন্ন অর্থবছরে মোট দুই লাখ উনিশ হাজার দুশো আটাশি টাকার একটি বড় অঙ্কের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়েছিল। এর মধ্যে প্রথম অর্থবছরের এক লাখ চৌত্রিশ হাজার ছশো আশি টাকা এবং পরবর্তী অর্থবছরের চুরাশি হাজার ছশো আট টাকা দীর্ঘদিন ধরে পরিশোধ না করায় তা বকেয়ার খাতায় জমা হয়। শুধু ফায়ার সার্ভিস স্টেশনই নয়, বরং বিপিডিবির এই বিশেষ অভিযান চলাকালে আরও বেশ কিছু বাণিজ্যিক ও উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের বিশাল অংকের বকেয়া বিলের তথ্য উন্মোচিত হয়। অভিযানের সময় একটি বড় আকারের ওয়ার্কশপের কাছে আটচল্লিশ হাজার একাশি টাকা, একটি স্থানীয় পোল্ট্রি ফার্মের কাছে এক লাখ আট হাজার পাঁচশো একাশি টাকা এবং দুটি ভিন্ন কয়েল তৈরির কারখানার কাছে মোট পাঁচ লাখ সত্তর হাজার নয়শো চৌাত্তর টাকার বিপুল পরিমাণ বকেয়া বিদ্যুৎ বিল উদ্ধার করা হয়। এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কাউকেই ছাড় দেওয়া হয়নি এবং বকেয়া পরিশোধ না করার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের সবার বিদ্যুৎ সংযোগ একযোগে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ময়মনসিংহ অঞ্চলের অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের একদল অভিজ্ঞ কর্মকর্তার সরাসরি নির্দেশ ও নেতৃত্বে কুলিয়ারচরের এই সফল অভিযানটি পরিচালিত হয়। এই বিশেষ টিমটিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন ময়মনসিংহ বাণিজ্যিক পরিচালন বিভাগের সম্মানিত অতিরিক্ত পরিচালক আতাউর রহমান এবং আঞ্চলিক হিসাব দপ্তরের সুদক্ষ উপপরিচালক সত্যজিৎ সরকার, যাঁদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে মাঠের এই বকেয়া আদায় ও সংযোগ বিচ্যুতির কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের এই শীর্ষ কর্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্যই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক এবং বিল পরিশোধে দীর্ঘসূত্রিতা বা অনীহা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার এই কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক প্রিপেইড মিটার স্থাপন করার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনোভাবেই এভাবে বিল বকেয়া পড়ার সুযোগ না থাকে।
বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন অন্তর্ভুক্ত থাকায় সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স হলো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, যাদের প্রতিদিনের কাজের সঙ্গে মানুষের জীবন ও মালের নিরাপত্তা সরাসরি জড়িত। আকস্মিক কোনো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা যেকোনো ধরনের আকস্মিক উদ্ধার কার্যক্রমে বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দিতে হয় এই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের। এ ধরনের একটি সংবেদনশীল জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় ফায়ার স্টেশনটির দৈনন্দিন স্বাভাবিক কার্যক্রম বা অপারেশনাল কার্যক্রমে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি একটি প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকায় উদ্ধারকাজের প্রস্তুতি বা জরুরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোনো ব্যাঘাত ঘটছে কি না, সে বিষয়েও অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, কুলিয়ারচরে পরিচালিত এই ঝটিকা অভিযানে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সর্বমোট পাঁচ প্রতিষ্ঠানের কাছে থেকে বিপিডিবির মোট বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে নয় লাখ ছেচল্লিশ হাজার নয়শো চব্বিশ টাকা। এই বিশাল অঙ্কের বকেয়া সরকারি কোষাগারে আদায়ের লক্ষ্যেই বিদ্যুৎ বিভাগ এমন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কুলিয়ারচর এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত আবাসিক প্রকৌশলী মো. তৌহিদুল হাসান সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার করে জানান যে, দীর্ঘ একটি দীর্ঘ সময় ধরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নির্ধারিত বিদ্যুৎ বিল নিয়মিত পরিশোধ না করায় কুলিয়ারচর বিদ্যুৎ অফিসের নিয়মানুযায়ী এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই এই সংযোগগুলো বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আধুনিক প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে এবং এখন থেকে তাদের সম্পূর্ণ প্রিপেইড মিটারের নিয়মের মাধ্যমেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হবে। তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সমস্ত বকেয়া বিল যথাযথ নিয়মে সম্পূর্ণ পরিশোধ করার সঙ্গে সঙ্গেই বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মমাফিক দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের সংযোগগুলো পুনঃস্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।