এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে বিশ্ববাজারের তেল

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৬ বার

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। বিশেষ করে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে কি না—এ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বাজারে তেলের দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) প্রকাশিত আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় রাত ১২টা ১৩ মিনিটে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৭ দশমিক ৮১ ডলারে স্থির ছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৮২ দশমিক ২০ ডলার। আগের দিন দুই ধরনের তেলের দামই ৫ শতাংশের বেশি বেড়েছিল।

এই উত্থানের ফলে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই—উভয় ধরনের অপরিশোধিত তেলের দামই ৩১ জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। বাজারে একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক টানাপোড়েন বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলছে।

তেলের বাজারে সাম্প্রতিক উত্থানের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে হরমুজ প্রণালির অনিশ্চিত পরিস্থিতিকে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য পরিবহন করা হয়। ফলে এই জলপথে স্বাভাবিক নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি বাড়ে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার বিষয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছেন। সর্বশেষ তিনি যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য ইরানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। এতে দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে সংশয় আরও বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তেলের বাজারে শুধু বাস্তব সরবরাহ নয়, ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কাও দামের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা যত দীর্ঘ হবে, জ্বালানি পরিবহন, বিমা ও বিকল্প রুট ব্যবহারের খরচ তত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা আগাম মূল্য সমন্বয় করেন। ফলে বাস্তবে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আগেই অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ দিয়ে তেল রপ্তানির প্রবাহ সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ৭ আগস্ট শেষ হওয়া সপ্তাহে প্রণালিটি দিয়ে তেল রপ্তানি দিনে প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে, যেখানে তার আগের সপ্তাহে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৪ লাখ ব্যারেল। সরবরাহ প্রবাহের এই পরিবর্তন বাজারের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সৌদি আরবের জাজান শোধনাগারের কার্যক্রম পুনরায় চালুর সময় পিছিয়ে দেওয়ার খবরও বাজারে প্রভাব ফেলেছে। একই সময়ে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় জ্বালানি পরিবহনের বিমা ব্যয়ও বাড়তে পারে বলে বাজার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু জ্বালানি কোম্পানি বা তেল আমদানিকারকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অপরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘ সময় উঁচু থাকলে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় এবং পণ্য পরিবহনের খরচ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষ করে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয় ও স্থানীয় কর-শুল্কের মতো বিষয় যুক্ত হয়ে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির চাপ তৈরি করতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধিই সরাসরি স্থানীয় বাজারে একই হারে প্রতিফলিত হয় না; সংশ্লিষ্ট দেশের মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা ও সরকারি নীতিও এতে ভূমিকা রাখে।

এদিকে সোমবারের বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির পর মঙ্গলবার তেলের বাজারে দাম তুলনামূলক স্থির থাকলেও বিনিয়োগকারীদের নজর এখন মূলত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক এবং হরমুজ প্রণালির পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে। দ্রুত কোনো কূটনৈতিক সমাধান হলে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কমে তেলের দামে নিম্নমুখী চাপ আসতে পারে। বিপরীতে সংঘাত বা নৌপথের অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে তেলের দামে আরও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক নৌচলাচল কখন পুরোপুরি ফিরবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় অগ্রগতি না হলে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকতে পারে। আর সেই অনিশ্চয়তাই আন্তর্জাতিক তেলের বাজারকে আগামী দিনগুলোতেও অস্থির রাখার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত