প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সম্প্রসারিত অপরিহার্য ওষুধের তালিকা এবং ওষুধ মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি আমলাতান্ত্রিক ও আইনি মারপ্যাঁচের অজুহাতে বাতিল করার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি। দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত জোরালো ভাষায় অভিযোগ করেছেন যে, বর্তমান প্রশাসন এই ধরনের জনবিরোধী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বহুজাতিক এবং দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে দেশের সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্পূর্ণভাবে সঁপে দেওয়ার এক গভীর অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। অবিলম্বে এই জনস্বার্থবিরোধী ও গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল না করা হলে দেশের আপামর জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। গত সোমবার জাতীয় নাগরিক পার্টির সম্মানিত আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং সদস্য সচিব আখতার হোসেন স্বাক্ষরিত এক যৌথ বিবৃতিতে এই চরম উদ্বেগের কথা প্রকাশ করা হয়।
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পূর্ববর্তী সময় পর্যন্ত দেশের স্বাস্থ্য খাতের অবহেলার কারণে অপরিহার্য ওষুধের নামমাত্রালিকায় মাত্র একশো সতেরোটি ওষুধ অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার বাস্তব চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রায় চল্লিশ শতাংশই সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুগোপযোগী ও জনকল্যাণমুখী সংস্কারের মাধ্যমে সেই সংক্ষিপ্ত তালিকাটিকে সম্প্রসারিত করে দুইশো পঁচানব্বইটি জীবনরক্ষাকারী ওষুধে উন্নীত করেছিল এবং সেগুলোর ওপর সরকারের পক্ষ থেকে একটি কঠোর মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এই দুইশো পঁচানব্বইটি অপরিহার্য ওষুধ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় আশি শতাংশ মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার মৌলিক চাহিদা মেটাতে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম ছিল। তৎকালীন ওই জনবান্ধব নীতিতে প্রতিটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য তাদের মোট বার্ষিক বিক্রয়ের অন্তত পঁচিশ শতাংশ অপরিহার্য ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল এবং নির্ধারিত শর্ত না মানলে নতুন ওষুধের লাইসেন্স বা অনুমোদন বন্ধ রাখার মতো কঠোর বিধানও রাখা হয়েছিল।

কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরই কতিপয় সুবিধাভোগী ওষুধ কোম্পানির অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের স্বার্থরক্ষা করতে সেই অত্যন্ত জনমুখী ও কল্যাণকর নীতি সম্পূর্ণরুপে বাতিল করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে এনসিপি। সম্প্রসারিত সেই তালিকাটিকে আবারও সংকুচিত করে আগের মতো একশো সতেরোটিতে নামিয়ে এনে মূলত দেশের ওষুধ বাজার ও মূল্য নির্ধারণের পূর্ণ ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা সিন্ডিকেট বা ফার্মা মাফিয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সরকারের এমন একপাক্ষিক ও হঠকারী সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবেই দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তাকে ধ্বংস করে প্রাইভেট কোম্পানিগুলোকে সীমাহীন লুটপাটের সুযোগ করে দেওয়ার একটি নগ্ন রাজনৈতিক চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। সরকারের এ ধরনের অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত সরাসরি দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যার খেসারত দিতে হবে সাধারণ রোগীকে।
এই গণবিরোধী সিদ্ধান্তের মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগে আক্রান্ত দেশের কোটি কোটি মানুষ সঠিক চিকিৎসা সেবা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়ে অকাল মৃত্যুর মুখে পতিত হবেন। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ক্যানসার, অ্যাজমা এবং কিডনি রোগের মতো মারাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি ক্রনিক রোগে আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত ও অবিচ্ছিন্নভাবে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সেবন করতে হয়। বাজারে ওষুধের দাম যদি অস্বাভাবিক ও লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পায়, তবে দেশের লাখ লাখ দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষ অর্থাভাবের কারণে বাধ্য হয়ে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেবেন, যা অদূর ভবিষ্যতে দেশে এক ভয়াবহ অকাল মৃত্যু ও জটিল ব্যাধির মহামারি ডেকে আনবে। অতীতে ঔপনিবেশিক বা সাম্রাজ্যবাদী লবিং ও বহুজাতিক তোষণ উপেক্ষা করে ১৯৮২ সালে যে জনমুখী জাতীয় ওষুধনীতির গৌরবোজ্জ্বল যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজকের এই সিদ্ধান্ত তার সম্পূর্ণ বিপরীত এবং এটি মূলত ৩২ বছরের পুরোনো অকার্যকর ব্যবস্থার পুনর্জন্ম ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির স্থায়ী বন্দোবস্ত করার এক নোংরা পদক্ষেপ।

বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে যে, আজ দেশের রাজনীতিবিদ, অসাধু আমলা এবং ওষুধ খাতের প্রভাবশালী অলিগার্কদের এক ধরনের অশুভ আঁতাত রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে জোরালো দাবি জানানো হয়েছে যে, অপরিহার্য ওষুধের তালিকা বাতিলের এই অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে এবং দুইশো পঁচানব্বইটি ওষুধের জন্য একটি কার্যকর ও শক্তিশালী মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুনরায় চালু করতে হবে। কোনো ধরনের অস্পষ্ট পরিপত্র বা অজুহাতের আড়ালে নয়, বরং সরকারের সরাসরি গেজেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশের বাজারের সব প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বা এমআরপি স্পষ্টভাবে বেঁধে দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে হবে। ১৯৮২ সালের মূল চেতনার ঐতিহাসিক আদর্শকে ধারণ করে বর্তমান সময়ের জটিল ব্যাধি ও আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বিজ্ঞানসম্মত ও জনমুখী জাতীয় ওষুধনীতি অবিলম্বে প্রণয়ন করার দাবি জানানো হয়েছে।