প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের চলমান দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতের ইতিহাসে গত কয়েক দিনে এক নতুন ও নাটকীয় অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। কৃষ্ণসাগর উপকূলীয় অঞ্চল রাশিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য এক বিশেষ স্পর্শকাতর এলাকা হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাশিয়ার অভ্যন্তরে, বিশেষ করে কৃষ্ণসাগর তীরবর্তী গেলেনঝিক অঞ্চলের অদূরে অত্যন্ত শক্তিশালী এস-৪০০ ট্রায়াম্ফ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে। রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পরাস্ত করে এই আঘাত হানা কেবল একটি সামরিক সাফল্য নয়, বরং এটি প্রেসিডেন্ট পুতিনের তথাকথিত দুর্ভেদ্য নিরাপত্তার আবহে এক বড় ধরনের ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
ঘটনার বিশদ বিবরণে জানা যায়, ইউক্রেনের মানববিহীন ব্যবস্থা বাহিনীর কমান্ডার মেজর রবার্ট ব্রোভদি দাবি করেছেন যে, তাদের প্রেরিত ড্রোনটি যখন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে, তখন সেখানে ব্যাপক বিস্ফোরণ ঘটে। এস-৪০০ হলো রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা কৌশলের প্রাণকেন্দ্র, যা বিমান, ড্রোন ও যেকোনো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। অথচ সেই শক্তিশালী ব্যবস্থার উৎক্ষেপণকারী বা লঞ্চারটি ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়ে টানা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে জ্বলতে থাকে এবং আকাশ ছেয়ে যায় ঘন কালো ধোঁয়ায়। পুতিনের কৃষ্ণসাগর উপকূলীয় বিলাসবহুল বাসভবন, যা বিশ্বজুড়ে ‘পুতিনের প্রাসাদ’ নামে পরিচিত, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিশাল নেটওয়ার্কের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল এই এস-৪০০ ব্যবস্থা। প্রাসাদের সুরক্ষায় নিয়োজিত বাফার জোনের ভেতরে থাকা এই অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থার এমন করুণ পরিণতি স্বাভাবিকভাবেই রুশ সামরিক নেতৃত্বের জন্য এক বড় ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

পুতিনের এই বিশাল বাসভবন কমপ্লেক্সটির চারপাশ প্রায় ২৭ বর্গমাইলের একটি নিষিদ্ধ আকাশসীমা বা বাফার জোন দ্বারা বেষ্টিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও অ্যালেক্সেই নাভালনির দুর্নীতিবিরোধী ফাউন্ডেশনের অনুসন্ধানে এই প্রাসাদের যে বিলাসবহুল বর্ণনা উঠে এসেছে, তা যেকোনো সাধারণ মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। ইতালীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই প্রাসাদে রয়েছে ক্যাসিনো, আঙুরের বাগান, স্পা সেন্টার, বরফে স্কেটিং করার জন্য আলাদা জায়গা, ব্যক্তিগত থিয়েটার এবং জলজ ডিসকোর মতো অবিশ্বাস্য সব সুযোগ-সুবিধা। এর বাইরেও ছোট রেলগাড়ির জন্য কক্ষ এবং সুসজ্জিত প্রার্থনাকক্ষসহ নানান বিলাসবহুল আয়োজন রয়েছে। তবে সামরিক গোয়েন্দা তথ্যে প্রকাশ পেয়েছে যে, এই প্রাসাদটি কেবল বিলাসিতার জায়গা নয়, বরং এটি রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেনীয় লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর একটি কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছিল। ইউক্রেনীয় কমান্ডার ব্রোভদির দাবি অনুযায়ী, গত ৮ আগস্ট ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ছোড়া ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্রের বেশ কয়েকটি এই এস-৪০০ কেন্দ্র থেকেই উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল, যা এই ধ্বংসাত্মক হামলার যৌক্তিকতা তৈরি করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার এই তীব্রতা রাশিয়ার অভ্যন্তরে থাকা সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের একটি পরিষ্কার নির্দেশক। কেবল এই একটি আক্রমণ নয়, সাম্প্রতিক সময়ে তাতারস্তানের একটি তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের চার শতাধিক ড্রোনের সমন্বিত হামলা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওই হামলায় ১৩ জন নিহতের পাশাপাশি ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। সাইবেরিয়ার তিউমেন এলাকাসহ রাশিয়ার দূরবর্তী এলাকাগুলোতেও ড্রোন হামলার ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার খবর আসায় বোঝা যাচ্ছে যে, রাশিয়ার ভূখণ্ডের বিশাল এলাকা এখন ইউক্রেনের ড্রোন অভিযানের আওতায় চলে এসেছে। পুতিন নিজে এই প্রাসাদটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ সতর্ক হলেও, এখন কৃষ্ণসাগরের উপকূলে ইউক্রেনের ক্রমবর্ধমান ড্রোন হামলার কারণে এই এলাকাটি তার জন্য আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে পুতিন মস্কো থেকে ১৮৫ মাইল পূর্বে অবস্থিত ভালদাই হ্রদের কাছে অপেক্ষাকৃত কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত ব্যক্তিগত আবাসে বেশি সময় কাটাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা গত সোমবার দাবি করেছে যে, রাশিয়ার দুটি এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী ধ্বংস করার পাশাপাশি দখলকৃত ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার মাঝারি উচ্চতায় উড্ডয়নক্ষম ‘ওরিয়ন’ ড্রোন নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি প্রধান অ্যান্টেনাতেও তারা সফল আঘাত হেনেছে। সব মিলিয়ে ইউক্রেনের দাবি অনুযায়ী, এই হামলায় রাশিয়ার কয়েক কোটি ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ইউক্রেনীয় কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো রাশিয়ার ভেতরে নিয়মিত সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে যুদ্ধের খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। কিয়েভের নীতি-নির্ধারকদের ধারণা, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি যখন রাশিয়ার সাধারণ জনজীবনে ও সামরিক অবকাঠামোয় দৃশ্যমান হবে, তখনই মস্কো যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হবে। তবে এই দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মিখাইল গালুজিন। তার কঠোর ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার নিরাপত্তা স্বার্থ এবং সংঘাতের মূল কারণগুলোর সমাধান না করে কোনোভাবেই যুদ্ধবিরতি বা সামরিক অভিযান স্থগিত করা সম্ভব নয়।

ইউক্রেনের জন্য এই ড্রোন অভিযানগুলো কেবল সামরিক লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার নয়, বরং এটি তাদের টিকে থাকার এবং রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করার অন্যতম উপায়। রাশিয়ার কাছে আধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার মতো পর্যাপ্ত উন্নত ব্যবস্থা সীমিত থাকায় তারা এস-৪০০ জাতীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অস্বাভাবিক রকমের বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আর ইউক্রেন এখন ঠিক সেই দুর্বল দিকটিতেই ধারাবাহিকভাবে আঘাত হানছে। কৃষ্ণসাগরের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে রাশিয়ার গভীরে অবস্থিত তেল শোধনাগার পর্যন্ত প্রতিটি হামলা একটি সুশৃঙ্খল পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান ড্রোন হামলা রাশিয়ার সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে এবং বিশ্ববাসীর সামনে এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শতভাগ নিখুঁত হওয়া সত্ত্বেও ইউক্রেনের নিত্যনতুন উদ্ভাবনী ড্রোন কৌশল রাশিয়ার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংঘাতের এই নতুন পর্বে প্রযুক্তি ও কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার লড়াই এখন সমানে সমান পর্যায়ে পৌঁছেছে।