প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ এখন কার নিয়ন্ত্রণে—তা নিয়ে দুই দেশই পরস্পরবিরোধী দাবি করছে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি তাদের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রণালিটির ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।
দুই দেশের এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে। কারণ, পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগকারী হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি পরিবহন করা হয়।
ইরানের আধা সামরিক বাহিনী বাসিজের নবনিযুক্ত প্রধান হোসেইন তায়েব বৃহস্পতিবার দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি বর্তমানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের আঞ্চলিক অবস্থান দুর্বল করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
হোসেইন তায়েবের ভাষ্য, ইরান এখনো নিজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিস্থিতি পরিচালনা করছে এবং দেশটি নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তেহরান কার্যত জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নৌযানের চলাচল নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তারা নিজেদের হাতেই রাখতে চায়।
তবে ইরানের এই দাবির আগের দিনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পূর্ণ বিপরীত বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ওয়াশিংটনের এই বক্তব্যের লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং ইরান যাতে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে সামরিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।
এখানেই তৈরি হয়েছে মূল বিরোধ। ইরান বলছে, তেহরানের অনুমতি ছাড়া কোনো নৌযান হরমুজ অতিক্রম করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তারা পালন করবে। ফলে বাস্তবে প্রণালিতে সামরিক শক্তি, নৌ চলাচল ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন একসঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড ‘খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স’ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানায়, তেহরানের অনুমতি ছাড়া কোনো নৌযান হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হরমুজে স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করার যে দাবি করা হচ্ছে, সেটিকে ইরানের সামরিক কমান্ড ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইরান আরও একবার পরিষ্কার করেছে, যুদ্ধের বর্তমান বাস্তবতায় হরমুজ প্রণালিকে তারা শুধু একটি আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে দেখছে না; বরং এটিকে নিজেদের সামরিক ও কৌশলগত শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব বুঝতে হলে এর ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে ভূমিকার দিকে তাকাতে হয়। ইরানের দক্ষিণ উপকূল ও ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথ পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং পরবর্তী সময়ে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য এটি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পাঠানোর অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যাতায়াত করত। ফলে হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তেলের দাম বেড়ে গেলে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হয়। যুদ্ধের পর তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল সীমিত করে দেয়। এতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র ইরান অভিমুখী এবং ইরানের বন্দর থেকে ছেড়ে আসা জাহাজের চলাচল নিয়ন্ত্রণে নৌ অবরোধ আরোপ করে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় এমন বাণিজ্যিক জাহাজের আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষার চেষ্টা করবে তারা।
এই অবস্থান কার্যত হরমুজকে দুই পক্ষের সামরিক ও রাজনৈতিক চাপের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। ইরান একদিকে জলপথটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখার কথা বলছে।
এর মধ্যে জুন মাসে দুই দেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছিল। ওই সমঝোতার লক্ষ্য ছিল স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং পারস্য উপসাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা দ্রুত ফিরিয়ে আনা। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।
ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, সমঝোতার প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় তারা আবারও নির্দিষ্ট কিছু নৌযানের বিরুদ্ধে সীমিত ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, পারস্য উপসাগরে নৌযানকে হুমকি দেওয়ার মতো সক্ষমতা ইরানের হাতে যাতে না থাকে, সে লক্ষ্যেই দক্ষিণাঞ্চলে সামরিক অভিযান ও চাপ অব্যাহত রাখা হয়েছে।
হরমুজকে ঘিরে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ধারণা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল সমন্বয়ের সম্ভাব্য ব্যবস্থার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
মোখবারের প্রস্তাবের মূল ভাবনা হলো, হরমুজের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামোর আওতায় আনা, যা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করবে না। তেহরানের দৃষ্টিতে এমন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের ভিত্তিতে হরমুজ পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে পারবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এই ধরনের আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে কতটা গ্রহণ করবে, সেটি এখনো অনিশ্চিত। কারণ ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রপথের নিরাপত্তাকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক-রাজনৈতিক কর্মকর্তা রাসুল সানাই-রাদও জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সমঝোতার আওতায় অপর পক্ষ নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, তেহরান হরমুজকে আলোচনার টেবিলে চাপ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করতে চাইছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, ইরান যদি দীর্ঘ সময় হরমুজে নৌ চলাচল সীমিত রাখে, তাহলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে হরমুজে সামান্য বিঘ্নও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
তবে ‘হরমুজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ কথাটির অর্থ নিয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। প্রণালিটি কোনো একক দেশের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন একটি জলপথ নয়। এর এক পাশে ইরান এবং অন্য পাশে ওমানের ভূখণ্ড রয়েছে। আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের ক্ষেত্রে এর বিশেষ আইনগত গুরুত্ব রয়েছে। তাই সামরিকভাবে কোনো পক্ষ প্রভাব বিস্তার করতে পারলেও সেটিকে সরাসরি পুরো জলপথের আইনগত মালিকানা বা একক নিয়ন্ত্রণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
বাস্তবে বর্তমানে হরমুজে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাকে এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বলা যায়। ইরান উপকূলীয় অবস্থান, সামরিক সক্ষমতা এবং জলপথের ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে নৌ চলাচলে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র উন্নত নৌবহর, নজরদারি ব্যবস্থা ও সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে পাল্টা চাপ প্রয়োগ করতে সক্ষম।
এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হতে পারে বেসামরিক নৌপরিবহন। একটি জাহাজের জন্য হরমুজ অতিক্রম করা শুধু বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি এখন নিরাপত্তা, বীমা, সামরিক ঝুঁকি ও সম্ভাব্য হামলার বিষয়ও হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিটি যাত্রার আগে পরিস্থিতি নতুন করে মূল্যায়ন করতে হচ্ছে।
হরমুজ নিয়ে উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনেও পৌঁছাতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং এর প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও পড়তে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এমন পরিস্থিতি বিশেষভাবে কঠিন হতে পারে, কারণ জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি হয়।
এই কারণে হরমুজ প্রণালির বর্তমান সংকট শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিরোধ নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। সামরিক উত্তেজনা যত বাড়বে, আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তাও তত গভীর হবে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়—আসলে হরমুজ প্রণালি কার নিয়ন্ত্রণে? বর্তমান পরিস্থিতিতে এর একক উত্তর নেই। ইরান সেখানে শক্তিশালী বাস্তব প্রভাব ও নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত করার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রও সামরিক উপস্থিতি ও নৌ অবরোধের মাধ্যমে পাল্টা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ফলে ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নিয়ে দুই পক্ষের দাবি মূলত তাদের নিজ নিজ সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে।
হরমুজের ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করছে সামরিক শক্তির পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনার ওপর। একটি কার্যকর সমঝোতা ছাড়া এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন। আর সেই সমঝোতা যত দেরি হবে, ততই বাড়বে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য চাপ।