হিন্দু ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকার নেই: হাইকোর্ট

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৪ বার
হিন্দু ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকার নেই: হাইকোর্ট

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হিন্দু দায়ভাগা আইনের অধীনে কোনো ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় ওই ভাইয়ের সম্পত্তিতে তার বোন উত্তরাধিকারী বা ‘রিভার্সনার’ হিসেবে স্বত্ব দাবি করতে পারবেন না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, কোনো সম্পত্তিতে বর্তমানে বা ভবিষ্যতে যার আইনগত উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বার্থ নেই, তিনি সেই সম্পত্তির হস্তান্তরকে চ্যালেঞ্জ করার অধিকারও রাখেন না।

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার একটি জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা দেওয়ানি মামলার রিভিশন শুনানি শেষে হাইকোর্ট এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন। আদালত ২০০৮ সালে জারি করা রুল খারিজ করে অধস্তন আদালতের দেওয়া রায় ও ডিক্রি বহাল রেখেছেন।

‘অমর কুমার দাসের উত্তরাধিকারী লিলি রানী দাস এবং অন্যান্য বনাম ড. মনোরঞ্জন মহুরী এবং অন্যান্য’ মামলায় গত ৯ জুলাই বিচারপতি শেখ আবদুল আউয়াল ও বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলাম মূল রায়টি লিখেছেন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গত বুধবার প্রকাশিত হয়েছে।

মামলার সূত্রপাত প্রায় এক শতাব্দী আগে। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বাসিন্দা রামকান্ত বিশ্বাসের এক ছেলে ও তিন মেয়ে ছিলেন। ১৯২০ সালে রামকান্ত বিশ্বাস নিজের অর্থে তাঁর ছেলে সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের নামে পটিয়া উপজেলায় ১ দশমিক ৩৫ একর নালিশি জমি কিনে দেন। পরবর্তী সময়ে সতীশ চন্দ্র বিশ্বাস তাঁর বাবার জীবদ্দশাতেই মারা যান। এরপর ১৯৩৩ সালে মারা যান রামকান্ত বিশ্বাস।

সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী সাবিত্রী বালা ওই সম্পত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকারসূত্রে অধিকার লাভ করেন। পরে ১৯৯৬ সালে তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় জমিটি ড. মনোরঞ্জন মহুরীর কাছে বিক্রি করে দেন।

এরপর রামকান্ত বিশ্বাসের কন্যা শৌল বালা দাস ওই জমিতে উত্তরাধিকারসূত্রে নিজের অধিকার দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের স্ত্রী সাবিত্রী বালা যে বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে জমিটি হস্তান্তর করেছেন, সেটি জাল ও প্রতারণামূলক। পাশাপাশি আইনগত প্রয়োজন ছাড়া ওই দলিল সম্পাদন করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

১৯৯৮ সালে শৌল বালা দাস পটিয়ার আদালতে জমির উত্তরাধিকার দাবি করে দেওয়ানি মামলা করেন। তবে বিচারিক আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে ২০০০ সালের ২২ জুন তাঁর মামলা খারিজ করে দেন।

এই রায়ের বিরুদ্ধে শৌল বালা দাস চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতে আপিল করেন। আপিলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত জেলা জজ ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আপিলটিও খারিজ করে দেন।

এরপর অধস্তন আদালতের রায় ও ডিক্রিতে সংক্ষুব্ধ হয়ে তিনি দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারার অধীনে ২০০৮ সালে হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই বছর হাইকোর্ট রুল জারি করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর সেই রুলের শুনানি শেষ হয় এবং চলতি বছরের ৯ জুলাই আদালত তা খারিজ করে দেন।

হাইকোর্টের রায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো হিন্দু দায়ভাগা আইনের অধীনে উত্তরাধিকার ও বিধবার সম্পত্তিগত অধিকার সম্পর্কে আদালতের ব্যাখ্যা। আদালত বলেছেন, কোনো হিন্দু পুরুষ মারা গেলে তাঁর বিধবা স্ত্রী তাঁর জীবদ্দশায় স্বামীর সম্পত্তিতে নির্দিষ্ট ধরনের অধিকার লাভ করেন। তবে সেই সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বিধবার ক্ষমতা সীমিত।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিধবা তাঁর হাতে থাকা ওই সম্পত্তি হস্তান্তর করলে সেই হস্তান্তরের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার সবার থাকে না। যিনি বিধবার মৃত্যুর পর ওই সম্পত্তির প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসেবে আইনগতভাবে সম্পত্তিটি পাওয়ার অধিকার রাখেন, মূলত তিনিই ‘রিভার্সনার’ হিসেবে ওই হস্তান্তরকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পান।

অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির বর্তমান বা ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তিতে আইনগত স্বার্থ না থাকলে কেবল হস্তান্তরটি আইনগত প্রয়োজন ছাড়া করা হয়েছে—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি আদালতে গিয়ে সেই হস্তান্তর বাতিলের দাবি করতে পারবেন না।

এই মামলায় হাইকোর্ট বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁর ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোন রিভার্সনার হিসেবে উত্তরাধিকার দাবি করতে পারবেন না। ফলে ওই সম্পত্তির হস্তান্তর নিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর আইনগত অবস্থান তৈরি হয় না।

রায়ের এই পর্যবেক্ষণ মূলত সম্পত্তির ওপর কার আইনগত স্বার্থ রয়েছে, তা নির্ধারণের গুরুত্বকে সামনে এনেছে। কোনো সম্পত্তি নিয়ে মামলা করার আগে শুধু পারিবারিক সম্পর্ক বা সম্ভাব্য উত্তরাধিকারসূত্রের দাবি যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনগত স্বার্থ ও উত্তরাধিকারী হিসেবে অবস্থান থাকতে হবে—রায়ের ব্যাখ্যায় বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

মামলায় শৌল বালা দাসের দাবি ছিল, তাঁর ভাই সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের সম্পত্তিতে তাঁর উত্তরাধিকারসূত্রে অধিকার রয়েছে। কিন্তু হাইকোর্ট দায়ভাগা আইনের বিধান ও উত্তরাধিকারের ক্রম বিশ্লেষণ করে সেই দাবি গ্রহণযোগ্য নয় বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছান। ফলে অধস্তন আদালত যে মামলা খারিজ করেছিলেন, তা বহাল থাকে।

আদালতের এ সিদ্ধান্ত সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক বিরোধের ক্ষেত্রে আইনগত উত্তরাধিকার নির্ধারণের বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে পুরোনো সম্পত্তি, বিধবার অধিকার এবং উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে কে আদালতে গিয়ে কোনো দলিল বা হস্তান্তরকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন, সেটি নির্ধারণে রায়ের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে পারে।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই মামলার দিকে তাকালে একটি পরিবারের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ কীভাবে প্রজন্ম পেরিয়ে আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে, তারও একটি চিত্র পাওয়া যায়। ১৯২০ সালে কেনা জমি, ১৯৩৩ সালে মালিকের মৃত্যু, ১৯৯৬ সালে সম্পত্তি বিক্রি, ১৯৯৮ সালে মামলা এবং এরপর বিচারিক আদালত, আপিল আদালত পেরিয়ে ২০০৮ সালে হাইকোর্টে রিভিশন—সব মিলিয়ে বিরোধটি কয়েক দশক ধরে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল।

হাইকোর্টের রায়ে শেষ পর্যন্ত অধস্তন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল থাকায় ওই দীর্ঘ আইনি বিরোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। একই সঙ্গে দায়ভাগা হিন্দু আইনে বিধবার অধিকার, রিভার্সনারের অবস্থান এবং সম্পত্তি হস্তান্তর চ্যালেঞ্জ করার আইনগত সক্ষমতা নিয়েও আদালতের ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।

তবে নির্দিষ্ট কোনো সম্পত্তি নিয়ে উত্তরাধিকার বিরোধ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট দলিল, উত্তরাধিকারসূত্র, সম্পত্তির প্রকৃতি এবং প্রযোজ্য আইন আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ একটি মামলার নির্দিষ্ট তথ্য ও আদালতের পর্যবেক্ষণ অন্য সব সম্পত্তি বিরোধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একইভাবে প্রযোজ্য হবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

এই মামলায় হাইকোর্টের মূল বার্তা হলো, উত্তরাধিকার দাবি কিংবা সম্পত্তি হস্তান্তর চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে আইনগত স্বার্থ ও উত্তরাধিকারীর অবস্থানই গুরুত্বপূর্ণ। সেই আইনগত অবস্থান না থাকলে কেবল পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে অন্যের সম্পত্তির হস্তান্তর নিয়ে আদালতে দাবি তোলার সুযোগ নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত