৫ সেকেন্ডে ৮০০ কিমি, চীনের ম্যাগলেভে নতুন রেকর্ড

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার
৫ সেকেন্ডে ৮০০ কিমি, চীনের ম্যাগলেভে নতুন রেকর্ড

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চীনে পরীক্ষামূলক উচ্চগতির ম্যাগলেভ ট্রেন প্রযুক্তিতে নতুন মাইলফলক তৈরি হয়েছে। দেশটির গবেষকেরা মাত্র ৫ দশমিক ৩ সেকেন্ডে একটি ১ দশমিক ১ টন ওজনের ট্রেনকে স্থির অবস্থা থেকে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতিতে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। মাত্র এক কিলোমিটার দীর্ঘ পরীক্ষামূলক ট্র্যাকেই এই গতি অর্জন করা হয়েছে। গবেষকদের দাবি, পরীক্ষাটি অতি উচ্চগতির পরিবহন প্রযুক্তির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

হুবেই প্রদেশের দুংহু ল্যাবরেটরিতে পরিচালিত এই পরীক্ষায় ট্রেনটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল গতি অর্জন করে। এরপর স্বয়ংক্রিয় ব্রেকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ট্রেনটিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে থামানো হয়। মাত্র ২০০ মিটারের মধ্যে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতির ট্রেনকে সম্পূর্ণ থামাতে সক্ষম হওয়ায় পরীক্ষাটিকে শুধু গতি অর্জনের সাফল্য হিসেবে দেখছেন না গবেষকেরা। উচ্চগতিতে নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদভাবে থামানোর সক্ষমতাকেও তারা গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচনা করছেন।

ম্যাগলেভ প্রযুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য হলো চৌম্বক শক্তির সাহায্যে ট্রেনকে রেলপথের কিছুটা ওপরে ভাসিয়ে রাখা। প্রচলিত রেলগাড়ির মতো চাকা ও রেলের মধ্যে সরাসরি ঘর্ষণ না থাকায় গতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা কমে যায়। ট্র্যাকের পাশে বা ভেতরে থাকা বিশেষ কয়েল থেকে উৎপন্ন তড়িৎ-চৌম্বকীয় শক্তি ট্রেনকে সামনে এগিয়ে নেয়। ফলে প্রচলিত রেলব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি গতিতে চলার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

চীনা গবেষকদের সাম্প্রতিক পরীক্ষার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো অতি দ্রুত গতি বাড়ানোর সক্ষমতা। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছানো সাধারণ রেল পরিবহনের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রযুক্তিগত বাস্তবতা তুলে ধরে। এত দ্রুত গতি অর্জনের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ, তড়িৎ-চৌম্বকীয় প্রপালশন, লেভিটেশন নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রেনের স্থিতিশীলতা একসঙ্গে সমন্বয় করা প্রয়োজন হয়।

এই পরীক্ষার মাধ্যমে গবেষকেরা সেই ব্যবস্থাগুলোর সর্বোচ্চ সক্ষমতা যাচাই করেছেন। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে ট্রেনকে কীভাবে দ্রুত ও নিরাপদে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেটিও পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষার পর ট্রেনটিকে স্বয়ংক্রিয় ব্রেকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ধীরে ধীরে থামানো হয়। উচ্চগতির পরিবহন প্রযুক্তিতে এই নিয়ন্ত্রণক্ষমতা ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

এটি অবশ্য চীনের ম্যাগলেভ গবেষণায় প্রথম বড় সাফল্য নয়। গত কয়েকটি পরীক্ষায় একই ধরনের ট্রেন একাধিকবার নিজের রেকর্ড ভেঙেছে। ২০২৫ সালের জুনে ১ দশমিক ১ টন ওজনের ট্রেনটি প্রথম পরীক্ষায় প্রায় সাত সেকেন্ডে ঘণ্টায় ৬৫০ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছেছিল। এরপর পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে গতি বাড়িয়ে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার এবং পরে ৭৯৮ কিলোমিটার পর্যন্ত নেওয়া হয়। সর্বশেষ পরীক্ষায় সেই সীমা পেরিয়ে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটারে পৌঁছেছে ট্রেনটি।

এই ধারাবাহিকতা থেকে বোঝা যায়, চীনা গবেষকেরা শুধু একটি নির্দিষ্ট গতির রেকর্ড তৈরির দিকে এগোচ্ছেন না। বরং অতি উচ্চগতির ম্যাগলেভ প্রযুক্তির বিভিন্ন উপাদানকে ধাপে ধাপে উন্নত করার চেষ্টা চলছে। দ্রুত ত্বরণ, উচ্চগতিতে স্থিতিশীলতা এবং নিয়ন্ত্রিত ব্রেকিং—প্রতিটি ক্ষেত্রেই গবেষণা চালানো হচ্ছে।

তবে পরীক্ষামূলক ট্র্যাকে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতি অর্জন করলেই এই প্রযুক্তি যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে, এমনটা মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান সময়ে মানুষের নিয়মিত যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত ম্যাগলেভ ট্রেনগুলোর গতি এর তুলনায় অনেক কম। চীন ও জাপানে চলাচলকারী ম্যাগলেভ ট্রেনের গতি সাধারণত ঘণ্টায় কয়েক শ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, আরাম, অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

অতি উচ্চগতির ট্রেনকে দীর্ঘ দূরত্বে চালাতে হলে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের অবকাঠামো প্রয়োজন হতে পারে। ট্র্যাককে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। সামান্য ত্রুটিও এত উচ্চগতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থাকে বিপুল ক্ষমতার চাপ সামলাতে সক্ষম হতে হবে।

আরেকটি বড় বিষয় হলো যাত্রী নিরাপত্তা। পরীক্ষাগারে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে একটি ট্রেনকে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতিতে নেওয়া এবং শত শত যাত্রী নিয়ে দীর্ঘ দূরত্বে নিয়মিত একই গতি বজায় রাখা এক বিষয় নয়। বাস্তব পরিবেশে আবহাওয়া, জরুরি পরিস্থিতি, যান্ত্রিক ত্রুটি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত ত্বরণের প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।

চীনের জাতীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরাও অতি উচ্চগতির ম্যাগলেভ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। তাদের একটি পরীক্ষায় মাত্র দুই সেকেন্ডে ঘণ্টায় প্রায় ৬৯৭ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছানোর সক্ষমতা দেখানো হয়েছে। ফলে দেশটিতে একই সময়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে অতি উচ্চগতির পরিবহন প্রযুক্তির সীমা পরীক্ষা করছে।

এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার শুধু যাত্রী পরিবহনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকদের ধারণা, ম্যাগলেভের উচ্চক্ষমতার তড়িৎ-চৌম্বকীয় প্রপালশন এবং দ্রুত ত্বরণ প্রযুক্তি ভবিষ্যতে রকেট বা যুদ্ধবিমান উৎক্ষেপণব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে। অর্থাৎ একটি পরীক্ষামূলক ট্রেনের গতি অর্জনের গবেষণা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত প্রযুক্তিগত প্রয়োগের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

চীনা বিজ্ঞানীরা এর পাশাপাশি স্বল্পচাপ বা প্রায় বায়ুশূন্য টিউবের ভেতর অতি উচ্চগতির ট্রেন চালানোর প্রযুক্তি নিয়েও গবেষণা করছেন। টিউবের ভেতর বায়ুর প্রতিরোধ অনেক কমিয়ে দিলে তাত্ত্বিকভাবে ট্রেনের গতি আরও বাড়ানো সম্ভব। এ ধরনের প্রযুক্তি সফল হলে দীর্ঘ দূরত্বের যাতায়াতে সময় নাটকীয়ভাবে কমে আসতে পারে।

তবে সেই সম্ভাবনার পাশাপাশি ব্যয় ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জও বিশাল। দীর্ঘ দূরত্বে বিশেষ টিউব বা ম্যাগলেভ ট্র্যাক নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। ট্র্যাকের সামান্য ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ বা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যও অত্যাধুনিক ব্যবস্থা দরকার হবে। ফলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

চীনের সর্বশেষ পরীক্ষাটি তাই আপাতত একটি গবেষণাগারভিত্তিক প্রযুক্তিগত অর্জন হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কিন্তু মাত্র কয়েক সেকেন্ডে ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটার গতি অর্জনের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, রেল পরিবহনের প্রচলিত সীমা নিয়ে গবেষকেরা কতটা দূর এগোতে চাইছেন। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি যাত্রী পরিবহনে বাস্তব রূপ পাবে কি না, তা নির্ভর করবে নিরাপত্তা, খরচ, অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতার পরীক্ষায় কতটা সফল হওয়া যায় তার ওপর।

একটি বিষয় অবশ্য স্পষ্ট—রেলপথে গতির ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রতিযোগিতায় চীন এখন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী পথে এগোচ্ছে। ঘণ্টায় ৮০০ কিলোমিটারের এই পরীক্ষামূলক সাফল্য সেই দৌড়ে দেশটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য প্রদর্শন হয়ে থাকল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত