চূড়ান্ত পর্যায়ে নবম পে স্কেল, ঘোষণার অপেক্ষা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৫ বার
চূড়ান্ত পর্যায়ে নবম পে স্কেল, ঘোষণার অপেক্ষা

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নবম জাতীয় পে স্কেল ঘোষণার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। যেকোনো সময় নতুন বেতন কাঠামোর ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার। রোববার (১৬ আগস্ট) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। এরই মধ্যে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য পে স্কেলের খসড়া নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করেছে সচিব কমিটি।

দীর্ঘ সময় ধরে নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এ খবরে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। মূল্যস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম, বাসাভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন-ভাতা পুনর্নির্ধারণের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। বিশেষ করে ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হওয়ার পর নতুন কোনো জাতীয় বেতন কাঠামো না আসায় বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষও বাড়ছিল।

মুখ্য সচিব বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে নতুন কোনো বেতন কাঠামো না থাকায় দেশের প্রায় ১৮ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে রয়েছেন। নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হবে এবং সাধারণ মানুষের জন্যও এর কিছুটা প্রভাব থাকতে পারে। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে বেতন সমন্বয় করাও জরুরি হয়ে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রিপরিষদসচিবের নেতৃত্বাধীন সচিব কমিটি ইতোমধ্যে নবম পে স্কেলের প্রস্তাব নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করেছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়া গেলে চলতি সপ্তাহেই বিষয়টি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে প্রস্তাবের বিভিন্ন দিক নিয়ে আরও পর্যালোচনা হতে পারে। বিশেষ করে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বেতন বৈষম্য কমানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।

প্রস্তাবিত কাঠামোতে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সব গ্রেডে একই হারে বেতন বাড়ানোর পরিবর্তে নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তুলনামূলকভাবে বেশি হারে বেতন বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। এর ফলে অপেক্ষাকৃত কম বেতন পাওয়া কর্মচারীরা মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় কিছুটা বেশি সুবিধা পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো একবারে পুরোপুরি কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে মূল বেতন বাড়ানোর বিষয়টি কার্যকর করার কথা রয়েছে। পরবর্তী ধাপে বাড়ানো হতে পারে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা। চলতি বছরের জুলাই থেকে নতুন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন শুরু করার পরিকল্পনার কথাও উঠে এসেছে। এরপর ধাপে ধাপে ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কত ধাপে এবং কোন সময়সূচিতে এটি কার্যকর হবে, সে সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভাই নেবে।

নতুন পে স্কেল প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত কিছু জটিলতাও সামনে এসেছে। এসব বিষয় সমাধানের জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে কমিটি সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে। ফলে চূড়ান্ত ঘোষণার আগে প্রশাসনিক ও আর্থিক বিভিন্ন বিষয় সমন্বয় করার কাজও চলছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষাপটও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হওয়ার পর থেকে নতুন কোনো জাতীয় বেতন কাঠামো দেওয়া হয়নি। যদিও এ সময়ে চাকরিজীবীরা নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন, কিন্তু একই সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। বাজারে খাদ্যপণ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নির্ধারিত বেতন দিয়ে আগের মতো জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি করে আসছেন চাকরিজীবীরা।

এই বাস্তবতায় নবম পে কমিশন গঠন করা হয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে কমিশন সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছিল। কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে নিম্ন বেতন গ্রেডের কর্মচারীদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তবে এর সঙ্গে সরকারের রাজস্ব ব্যয়ের ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।

পে স্কেল নিয়ে আলোচনা শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, সরকারি ব্যয়, রাজস্ব আয়, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়ও জড়িত। ফলে সরকারকে একদিকে চাকরিজীবীদের ন্যায্য প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ যেন তৈরি না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

মুখ্য সচিব দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকেও সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বহুমুখী সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে বলেও জানিয়েছেন। রাশিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও চীন থেকে জ্বালানি সরবরাহের সুযোগ তৈরির উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

সরকারের জন্য তাই নবম পে স্কেল বাস্তবায়ন একটি বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়লে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়তে পারে, যা অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এ কারণে নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও সময়সূচি নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নবম পে স্কেলের খসড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোয় এখন সরকারি চাকরিজীবীদের দৃষ্টি মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের দিকে। চূড়ান্ত অনুমোদন ও ঘোষণার পরই পরিষ্কার হবে কোন গ্রেডে কতটা বেতন বাড়ছে, কখন থেকে তা কার্যকর হবে এবং ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন আসছে। একই সঙ্গে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও অর্থনীতির ওপর এর সামগ্রিক প্রভাবও তখন আরও স্পষ্ট হবে।

সব মিলিয়ে নবম জাতীয় পে স্কেল এখন আর কেবল একটি দীর্ঘদিনের দাবি নয়; এটি সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার সঙ্গে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে। ঘোষণা যতই কাছাকাছি আসছে, ততই বাড়ছে প্রত্যাশা। এখন অপেক্ষা শুধু চূড়ান্ত অনুমোদন ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত