প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার দীর্ঘদিনের যৌথ সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’-এর পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানবিরোধী কর্মকাণ্ডে দক্ষিণ কোরিয়ার অংশ না নেওয়া এবং মহড়ার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে মহড়া শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে পেন্টাগনকে এ নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের বিষয়টিও সামনে এনেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, মহড়াটি পুরোপুরি বাতিল করার মতো পর্যাপ্ত সময় হাতে নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ মহড়ায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন। তাঁর বক্তব্যে ইরান ইস্যুতে দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান নিয়ে ক্ষোভের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে এই সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছরের মহড়া ১৭ থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলা এবং দুই দেশের সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতি ও সমন্বয় বাড়ানো এই মহড়ার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এ বছর এতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ১৮ হাজার সেনা অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
ট্রাম্পের নির্দেশের পরও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী মহড়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য এবং মহড়ার পরিধি কমানোর নির্দেশ নিয়ে তারা তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেনি। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের একজন মুখপাত্র এ বিষয়ে জানতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসও তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। ফলে মহড়ার কোন কোন অংশ কমানো হবে এবং এর সামরিক কার্যক্রমে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যৌথ মহড়া ওয়াশিংটন-সিউল নিরাপত্তা সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব মহড়ার গুরুত্বও বেড়েছে। তবে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের মহড়ার ব্যয় এবং সামরিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রথম মেয়াদেও তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহড়া বন্ধ বা সীমিত করার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। মহড়াগুলোকে কখনো ব্যয়বহুল, কখনো উসকানিমূলক হিসেবে সমালোচনা করেছেন তিনি। দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন মার্কিন সেনাদের ব্যয় ভাগাভাগি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির ভূমিকা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে মতপার্থক্য দেখা গেছে।
এবারের সিদ্ধান্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইরান ইস্যু। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার জন্য তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু সিউল তাতে সম্মতি দেয়নি বলে দাবি করেছেন তিনি। এই অবস্থান নিয়েই দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের বক্তব্যে উত্তর কোরিয়ার প্রসঙ্গও বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি কিম জং-উনের সঙ্গে নিজের ভালো সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনের উত্তর কোরিয়া নীতিতে সম্ভাব্য নতুন কৌশলের ইঙ্গিতও দেখছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহড়াকে উত্তর কোরিয়া বরাবরই নিজেদের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের প্রস্তুতি হিসেবে বর্ণনা করে থাকে। মহড়া শুরুর আগে উত্তর কোরিয়া আবারও সামরিক তৎপরতা দেখিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া সম্প্রতি তার পূর্ব উপকূল থেকে জাপান সাগরের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এর আগে চলতি মাসের শুরুতেও একই ধরনের স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের খবর পাওয়া যায়।
এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়া যখন ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক প্রস্তুতি কমিয়ে দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্টিমসন সেন্টারের গবেষণা কর্মসূচি থার্টি-এইট নর্থের প্রধান জেনি টাউনের মতে, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরির বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে। তাঁর মতে, ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই কিম জং-উনের সঙ্গে আবারও যোগাযোগের সুযোগ তৈরির চেষ্টা করছেন। তবে আকস্মিকভাবে মহড়ার পরিসর কমানোর সিদ্ধান্ত উত্তর কোরিয়ার ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটি এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
ট্রাম্প ও কিমের সম্পর্ক এর আগে নাটকীয় উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় দুই নেতা একে অপরকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করলেও পরে তাঁদের মধ্যে সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার আশা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ থেকে বড় কোনো বাস্তব অগ্রগতি আসেনি।
এবারও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ হয়ে রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে আসছেন, উত্তর কোরিয়া আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের জন্যও হুমকি তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহযোগিতা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্বেগ রয়েছে। ইউক্রেনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি অভিযোগ করা হয়েছে, রাশিয়ার হামলায় উত্তর কোরিয়ায় তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করতে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়েছে।
এ অবস্থায় দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়ার পরিসর কমানোর ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে শুধু ইরান ইস্যুর প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এর সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক, পূর্ব এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল এবং মিত্রদের কাছ থেকে ওয়াশিংটনের প্রত্যাশার বিষয়গুলোও জড়িয়ে রয়েছে।
তবে মহড়ার পরিসর কমলেও যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা সহযোগিতা পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। বরং সামরিক প্রশিক্ষণের ধরন ও অগ্রাধিকার পরিবর্তনের সম্ভাবনাই বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রচলিত সরাসরি সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সাইবার হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং কম্পিউটারভিত্তিক যুদ্ধ অনুশীলনের ওপর গুরুত্ব বাড়িয়েছে দুই দেশ।
এদিকে ট্রাম্পের নতুন নির্দেশ বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মহড়ার কোন অংশ কমানো হবে, কতসংখ্যক সেনা এতে অংশ নেবেন এবং ভবিষ্যতের যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণে এর কী প্রভাব পড়বে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ হয়নি।
ইরান ইস্যুতে মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে আরও সক্রিয় সহযোগিতা প্রত্যাশা করছেন ট্রাম্প—সাম্প্রতিক বক্তব্যে এমন বার্তাই স্পষ্ট। দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থানে অসন্তোষ প্রকাশ করে যৌথ সামরিক মহড়া সীমিত করার সিদ্ধান্ত সেই চাপেরই একটি প্রকাশ কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। একই সময়ে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা খুঁজছেন ট্রাম্প—এমন ইঙ্গিতও তাঁর বক্তব্যে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ওয়াশিংটন, সিউল ও পিয়ংইয়ংকে ঘিরে পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণ আগামী দিনগুলোতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।