ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে ইউরোপের আকাশপথে নতুন রেকর্ড

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৯ বার
ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে ইউরোপের আকাশপথে নতুন রেকর্ড

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইউরোপের বিমান চলাচলের মানচিত্রে দ্রুত বদলে যাচ্ছে শক্তির ভারসাম্য। তুরস্কের ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর উদ্বোধনের আট বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই যাত্রী পরিবহন, কার্গো হ্যান্ডলিং, আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সংযোগের ক্ষেত্রে ইউরোপের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত বিমানবন্দরগুলোর সঙ্গে জোরালো প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ের যাত্রী পরিবহনের হিসাব সেই পরিবর্তনেরই একটি বড় উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছে। এক মাসে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর দিয়ে ৮১ লাখ ৫০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেছেন, যেখানে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর ব্যবহার করেছেন প্রায় ৭৯ লাখ যাত্রী। ফলে জুলাইয়ের হিসাবে ইউরোপের ব্যস্ততম বিমানবন্দর হিসেবে হিথ্রোকে ছাড়িয়ে গেছে ইস্তাম্বুল।

২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর। শুরু থেকেই এটি ছিল তুরস্কের একটি উচ্চাভিলাষী অবকাঠামো প্রকল্প। বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের সক্ষমতা মাথায় রেখে বিমানবন্দরটির নকশা করা হয়। তুরস্কের লক্ষ্য ছিল শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বিমান যোগাযোগের প্রয়োজন মেটানো নয়, বরং ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ট্রানজিট কেন্দ্র তৈরি করা। কয়েক বছরের মধ্যেই সেই লক্ষ্য বাস্তব রূপ পেতে শুরু করেছে।

ইস্তাম্বুলের সবচেয়ে বড় সুবিধা তার ভৌগোলিক অবস্থান। শহরটি ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত এবং তুরস্ক নিজেই তিন মহাদেশের কাছাকাছি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে আছে। ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকার গন্তব্যে যাওয়া যাত্রীদের জন্য ইস্তাম্বুল একটি কার্যকর ট্রানজিট পয়েন্ট হয়ে উঠেছে। তুরস্কের কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, ইস্তাম্বুল থেকে প্রায় চার ঘণ্টার উড়ান দূরত্বের মধ্যে ৬৭টি দেশের প্রায় ১৫০ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। এই ভৌগোলিক সুবিধা বিমানবন্দরটির আন্তর্জাতিক যাত্রী ও ট্রানজিট ব্যবসা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিমানবন্দরটির উত্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে তুরস্কের জাতীয় বিমান সংস্থা তার্কিশ এয়ারলাইন্সের বিস্তৃত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। বিশ্বের বহু দেশের সঙ্গে সরাসরি বিমান যোগাযোগ গড়ে তুলেছে সংস্থাটি। ইস্তাম্বুলকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক ফ্লাইট পরিচালনা করায় বিমানবন্দরটি দ্রুত একটি হাব হিসেবে শক্তিশালী হয়েছে। একজন যাত্রী ইউরোপের একটি শহর থেকে ইস্তাম্বুলে এসে সেখান থেকে এশিয়া, আফ্রিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য একটি গন্তব্যে যেতে পারেন। এই ট্রানজিট মডেল বিমানবন্দরটির যাত্রীসংখ্যা দ্রুত বাড়াতে সহায়তা করেছে।

জুলাইয়ের যাত্রীসংখ্যা সেই প্রবৃদ্ধির একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিফলন। মাত্র এক মাসে ৮১ লাখ ৫০ হাজার যাত্রী বিমানবন্দরটি ব্যবহার করেছেন। একই সময়ে লন্ডনের হিথ্রোতে যাত্রীসংখ্যা ছিল প্রায় ৭৯ লাখ। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিত হিথ্রোর ওপর ইস্তাম্বুলের এই সাময়িক ছাড়িয়ে যাওয়া তাই বিমান চলাচল খাতের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও এক মাসের পরিসংখ্যান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নির্ধারণ করা যায় না, তবু এটি ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের দ্রুত বিকাশের শক্তিশালী ইঙ্গিত।

বিমানবন্দরটির সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইউরোপে প্রথমবারের মতো এমন একটি এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে একই সময়ে তিনটি বিমান রানওয়ে ব্যবহার করে উড্ডয়ন বা অবতরণ করতে পারে। এর ফলে রানওয়ের কার্যকর ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি আকাশপথে বিমান চলাচলের সক্ষমতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্ষেত্রে রানওয়ের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি বিমানবন্দরে যত বেশি নিরাপদ ও কার্যকরভাবে উড্ডয়ন-অবতরণ পরিচালনা করা যায়, সামগ্রিকভাবে তত বেশি ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হয়।

ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের আরেকটি শক্তিশালী দিক হচ্ছে এর কার্গো পরিবহন সক্ষমতা। যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনেও বিমানবন্দরটি দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিমানবন্দরটির কার্গো পরিবহন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১০ লাখ টনের বেশি হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি ইস্তাম্বুলকে ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এয়ার কার্গো কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য পণ্য পরিবহন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ই-কমার্স, উচ্চমূল্যের পণ্য, ইলেকট্রনিকস, ওষুধ, শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং দ্রুত সরবরাহ প্রয়োজন এমন পণ্যের জন্য আকাশপথের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে একটি বিমানবন্দরের কার্গো সক্ষমতা শুধু বিমান চলাচল খাত নয়, সংশ্লিষ্ট দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলে। ইস্তাম্বুলের কার্গো প্রবৃদ্ধি সেই দিক থেকেও তুরস্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কার্গো পরিবহনে প্রবৃদ্ধির ফলে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর ইউরোপের প্রচলিত বড় কার্গো কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। এত অল্প সময়ে এই অবস্থানে পৌঁছানো বিমানবন্দরটির সম্প্রসারণ পরিকল্পনার কার্যকারিতাও তুলে ধরছে। যাত্রী ও কার্গো—দুই ক্ষেত্রেই সক্ষমতা বাড়ানোর ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনে ইস্তাম্বুলের গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।

শহরের সঙ্গে বিমানবন্দরের যোগাযোগ ব্যবস্থাও যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি করেছে। সরাসরি মেট্রো সংযোগ চালুর ফলে ইস্তাম্বুলের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিমানবন্দরে যাতায়াত আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যত বড় হয়, তার সঙ্গে শহরের দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে সড়কপথে যানজটে আটকে থাকলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ে এবং বিমানবন্দরের আকর্ষণ কমতে পারে। মেট্রো সংযোগ সেই সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান তৈরি করেছে।

তবে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের বর্তমান সাফল্যকে চূড়ান্ত অবস্থান হিসেবে দেখছে না তুরস্ক। ভবিষ্যতে চতুর্থ রানওয়ে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বিমানবন্দরের উড্ডয়ন ও অবতরণের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে বছরে ২০ কোটি যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনাও রয়েছে। বর্তমান যাত্রী প্রবাহের সঙ্গে তুলনা করলে এটি বিশাল লক্ষ্য হলেও বিমানবন্দরটির নির্মাণ ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা শুরু থেকেই সেই ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় তৈরি করা হয়েছে।

ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের এই দ্রুত উত্থান তুরস্কের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। একটি বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শুধু যাত্রী পরিবহন করে না; এর সঙ্গে বিমান সংস্থা, পর্যটন, হোটেল, রেস্তোরাঁ, কার্গো, লজিস্টিকস, খুচরা ব্যবসা এবং নানা ধরনের সেবা খাত যুক্ত থাকে। ট্রানজিট যাত্রীর সংখ্যা বাড়লে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য ইস্তাম্বুলকে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারে পরিণত করার ক্ষেত্রেও বিমানবন্দরটির ভূমিকা রয়েছে।

এখানে প্রতিযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইউরোপের পুরোনো বিমানবন্দরগুলোর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। লন্ডনের হিথ্রোর মতো বিমানবন্দর দীর্ঘদিন ধরে বিপুল যাত্রী সামলাচ্ছে। কিন্তু পুরোনো বিমানবন্দরগুলোর ক্ষেত্রে নতুন রানওয়ে নির্মাণ, টার্মিনাল সম্প্রসারণ এবং শহরের ভেতর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা তুলনামূলক কঠিন। অন্যদিকে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর তুলনামূলক নতুন হওয়ায় ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের জন্য শুরু থেকেই জায়গা ও পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এই পার্থক্য দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে ইউরোপের বিমান চলাচলের বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে ইস্তাম্বুলকে আরও অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। যাত্রীসংখ্যা শুধু অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; বিমান সংস্থার নেটওয়ার্ক, টিকিটের মূল্য, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ চাহিদা এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে ইউরোপের অন্যান্য বড় বিমানবন্দরও নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে প্রতিযোগিতা আগামী দিনে আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তারপরও মাত্র আট বছরেরও কম সময়ে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের অর্জন নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। একটি নতুন বিমানবন্দর থেকে ইউরোপের অন্যতম ব্যস্ত বিমান চলাচল কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার এই যাত্রা তুরস্কের দীর্ঘমেয়াদি বিমান পরিবহন কৌশলের সাফল্যকে সামনে এনেছে। যাত্রী পরিবহন থেকে কার্গো, প্রযুক্তি থেকে শহরের সঙ্গে যোগাযোগ—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিমানবন্দরটি দ্রুত সক্ষমতা তৈরি করেছে।

ইউরোপের আকাশপথে ইস্তাম্বুলের এই উত্থান তাই শুধু একটি বিমানবন্দরের সাফল্যের গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে ভৌগোলিক অবস্থানকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর, আন্তর্জাতিক বিমান নেটওয়ার্ককে কেন্দ্র করে নতুন ট্রানজিট অর্থনীতি তৈরি এবং আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় জায়গা করে নেওয়ার একটি উদাহরণ। সামনে চতুর্থ রানওয়ে এবং আরও বড় যাত্রী সক্ষমতার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর ইউরোপের আকাশপথে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে। আর তখন হিথ্রোসহ ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী বিমানবন্দরগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতার চিত্রও আরও বদলে যেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত