প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সরকারের প্রথম ছয় মাসে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটির দাবি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, প্রশাসনে দলীয় নিয়োগ, ক্যাম্পাসে সহিংসতা এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। একই সঙ্গে সুশাসন, আইনশৃঙ্খলা, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রেও সরকার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছে দলটি।
সোমবার রাজধানীর বিজয়নগরে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সরকারের ছয় মাস: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা! জনগণের সামনে পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে দলের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু সরকারের কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, একটি নির্বাচিত সরকারের মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস খুব দীর্ঘ সময় নয়, তবে সরকারের মেয়াদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে। তাই এখন পর্যন্ত সরকারের কার্যক্রমের গতি, অগ্রাধিকার এবং বাস্তব ফলাফল নিয়ে আলোচনা করা জরুরি।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ছয় মাসেই একটি সরকারের পূর্ণাঙ্গ সফলতা বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তবে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, শাসনব্যবস্থা, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং গণতান্ত্রিক চর্চার মতো সূচক বিবেচনায় নিলে সরকারের অগ্রগতি আশানুরূপ নয়। বরং কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এবি পার্টির চেয়ারম্যানের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি। তার অভিযোগ, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের কারণে শিল্প ও ব্যবসা খাত চাপে পড়েছে। শত শত কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার দাবি করে তিনি বলেন, নতুন করে এক হাজারের বেশি কলকারখানা চালুর বিষয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তার মতে, শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হলে এর প্রভাব শুধু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়ে না; এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, শ্রমিকের আয়, বাজারে পণ্যের সরবরাহ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও যুক্ত।
মঞ্জু বলেন, সরকার নতুন কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা তৈরি করলেও বাস্তবে বেকারত্বের চাপ কমেনি। বরং অর্থনীতির গতি মন্থর হওয়ায় তরুণদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ না বাড়লে জনসংখ্যার বড় একটি অংশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দ্রব্যমূল্যের বিষয়টিও এবি পার্টির মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। দলটির দাবি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বেড়েছে। আয় একই গতিতে না বাড়ায় পরিবারের বাজেটে চাপ তৈরি হয়েছে। মঞ্জুর ভাষায়, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় জীবনমানের উন্নতি হয়নি। ফলে অর্থনৈতিক চাপ এখন শুধু নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান মঞ্জু। তার অভিযোগ, সরকার এ ধরনের পরামর্শ যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেনি। ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হতে পারে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের পুরোনো প্রভাবশালী চক্রগুলোর প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়নি।
সরকারের সুশাসন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এবি পার্টি। মজিবুর রহমান মঞ্জুর অভিযোগ, প্রশাসনের বিভিন্ন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয় বিবেচনার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্যাম্পাসভিত্তিক সহিংসতা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ঘটনা সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে বলে দাবি করেন তিনি।
সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথাও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরে এবি পার্টি। খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ধর্মীয় পুরোহিতদের ভাতার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও এসব কর্মসূচির কাঙ্ক্ষিত প্রভাব এখনো সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান হয়নি বলে মন্তব্য করেন মঞ্জু। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে বলেও তিনি দাবি করেন।
মজিবুর রহমান মঞ্জু আরও বলেন, সরকারের কার্যক্রমে যদি জনদুর্ভোগ বাড়তে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে আরও কঠিন হতে পারে। তার আশঙ্কা, বিরোধী দলকে আলাদা করে বড় কোনো আন্দোলনের ডাক দেওয়ার প্রয়োজন নাও হতে পারে; সাধারণ মানুষ নিজেরাই ক্ষোভ নিয়ে রাস্তায় নামতে পারেন। তবে তিনি সরকারের পুরো মেয়াদের মূল্যায়ন এখনই চূড়ান্ত না করে সামনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও ইঙ্গিত দেন।
তার সার্বিক মূল্যায়ন, ছয় মাসে সরকারের গতি ও অগ্রগতি হতাশাজনক। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর নীতির পরিবর্তে সরকারের কর্মকাণ্ডে ‘সবার আগে দলীয়তন্ত্র’ প্রাধান্য পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা আরও দুর্বল হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদও সরকারের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি আবার ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো যে কিছুটা সহনশীলতা রয়েছে, সেটিকে ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এই সহনশীলতা পুরো মেয়াদে ধরে রাখার আহ্বান জানান ফুয়াদ।
বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা নিয়েও সমালোচনা করেন এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক। তার দাবি, বিএনপির নিজেদের ঘোষিত সংস্কার প্রস্তাবের বেশ কিছু বিষয় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, গণভোট চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন বক্তব্য থাকলেও ৩১ দফা বিএনপির নিজেদের রাজনৈতিক প্রস্তাব। অথচ ওই প্রস্তাবের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
দলীয় নিয়োগ প্রসঙ্গে ফুয়াদ বলেন, যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিকে নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হলে আপত্তির কারণ নেই। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান বা খাতে দলীয় প্রভাব বিস্তার করা হলে সেটি সুশাসনের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে ক্রীড়াঙ্গনকে দলীয়করণ না করার বিষয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠন নিয়েও বিএনপির প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করেন ফুয়াদ। তার অভিযোগ, এসব ক্ষেত্রে যে ধরনের পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তব পদক্ষেপের যথেষ্ট মিল নেই। নির্বাচন কমিশনেও দলীয় নিয়োগের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করা না গেলে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হবে।
গুম ও মানবাধিকার প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক। তার অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা কিছু অধ্যাদেশ পরিবর্তন করে এমন আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যা আগের ব্যবস্থার তুলনায় দুর্বল। গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তদন্ত প্রক্রিয়া কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হবে, সে বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
জ্বালানি খাতের বেসরকারীকরণ নিয়েও সতর্ক অবস্থান জানিয়েছে দলটি। ফুয়াদ বলেন, তারা নীতিগতভাবে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের বিরোধী নন। তবে জ্বালানি খাতের মতো কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সংসদীয় নীতিমালা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না করে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। তার মতে, বেসরকারীকরণ হলে তা যেন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সুবিধা তৈরির পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থে হয়।
উগ্রবাদ মোকাবিলায়ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
এবি পার্টির এই মূল্যায়নের মধ্যে যেমন সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে কঠোর সমালোচনা রয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক সহনশীলতা বজায় থাকার মতো কিছু ইতিবাচক দিকও স্বীকার করা হয়েছে। ফলে দলটির বক্তব্যকে সরকারের প্রথম ছয় মাসের একটি রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে দলটি বিভিন্ন সময় সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করলেও একই সঙ্গে সংস্কার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ভারত সফর নিয়েও এবি পার্টির অবস্থান তুলে ধরা হয়। ফুয়াদ সরকারের এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক সম্মান এবং বাস্তবভিত্তিক কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর দলটির পক্ষ থেকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনীতি ও জনজীবনের সংকটকে সামনে রেখে এবি পার্টির এই মূল্যায়ন এমন সময়ে এসেছে, যখন সাধারণ মানুষের কাছে দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ এবং নিরাপদ জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। একটি সরকারের প্রথম ছয় মাসে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়—এটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সমস্যাগুলোর সমাধানে দৃশ্যমান অগ্রগতি হচ্ছে কি না, সেটিই শেষ পর্যন্ত সরকারের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার বড় মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়।
এবি পার্টির অভিযোগ ও মূল্যায়নের বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন খাতে নেওয়া উদ্যোগ এবং অর্জনের ব্যাখ্যা থাকাটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনৈতিক দলের মূল্যায়ন মূলত তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান থেকে আসে। তাই সরকারের কার্যক্রমের চূড়ান্ত মূল্যায়নে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান, কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন, মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং জনসেবা—সবকিছুর বাস্তব তথ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে এবি পার্টির সংবাদ সম্মেলনটি যে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে তা হলো, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, সেই ঘোষণার বাস্তব ফল মানুষের জীবনে পৌঁছে দেওয়া। বাজারে স্বস্তি, শিল্পে গতি, কর্মসংস্থানের সুযোগ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা—এসব ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ দ্রুত পরিবর্তন দেখতে চান। সামনে সরকারের কার্যক্রম সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে, সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।