প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাকিস্তানে মেডিক্যাল ও ডেন্টাল বিষয়ে অধ্যয়নরত আফগান শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (পিএমডিসি)। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নতুন করে আফগান শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রাখার পাশাপাশি পাকিস্তানের বিভিন্ন মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে অধ্যয়নরত আফগান শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
পিএমডিসির জারি করা একটি সরকারি চিঠির বরাতে আফগানিস্তানভিত্তিক সংবাদমাধ্যমগুলো এ তথ্য জানিয়েছে। সিদ্ধান্তটি কার্যকর হলে পাকিস্তানের মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা আফগান শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও পেশাগত পরিকল্পনা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যারা ইতোমধ্যে কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানে চিকিৎসাবিজ্ঞান বা দন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাক্রমে যুক্ত, তাদের জন্য এই সিদ্ধান্তের প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
পিএমডিসির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পাকিস্তানের মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্তমানে অধ্যয়নরত আফগান শিক্ষার্থীদের নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষাক্রমে নতুন করে কোনো আফগান শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা যাবে না। ফলে যারা পাকিস্তানে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বা ভর্তি প্রক্রিয়ায় ছিলেন, তাদেরও আপাতত শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হবে।
শুধু নতুন ভর্তি বা চলমান পড়াশোনা বন্ধ করাই নয়, আফগান শিক্ষার্থীদের এক মেডিক্যাল বা ডেন্টাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের পথও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোনো শিক্ষার্থী বর্তমান প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পারলে অন্য কোনো পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানেও মাইগ্রেশনের মাধ্যমে শিক্ষা অব্যাহত রাখার সুযোগ পাবেন না।
পিএমডিসি জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীতিগত নির্দেশনা এবং ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই কাউন্সিলের নেওয়া সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারি চিঠিতে বিষয়টিকে জাতীয় নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের সব মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনাটি কঠোরভাবে অনুসরণ করার জন্য বলা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে পাকিস্তানের শিক্ষা খাতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং বিশেষ করে আফগান শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘদিনের শিক্ষা সুযোগ নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আফগানিস্তানের ভৌগোলিক নৈকট্য, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এবং পাকিস্তানের তুলনামূলকভাবে বড় উচ্চশিক্ষা অবকাঠামোর কারণে দেশটির অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য পাকিস্তানকে বেছে নিয়ে থাকেন। মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষা তাদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি এবং এতে শিক্ষার্থীদের বড় অঙ্কের অর্থ, সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করতে হয়। অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার পর কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে তাত্ত্বিক শিক্ষা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং ক্লিনিক্যাল কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে চিকিৎসা পেশার জন্য প্রস্তুতি নেন। মাঝপথে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে তাদের শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা যেমন ব্যাহত হতে পারে, তেমনি ভবিষ্যৎ পেশাগত স্বীকৃতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
পিএমডিসির চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, যেসব আফগান শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে তাদের পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন, তাদের স্নাতক সম্পন্ন করার বিষয়টি যথাযথভাবে নথিভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে তারা পাকিস্তান ত্যাগ করেছেন কি না, সেই তথ্যও নিশ্চিত করে নথিতে সংরক্ষণ করতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষা সম্পন্ন করা আফগান শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের অবস্থান ও একাডেমিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য দিতে হবে।
নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য পাকিস্তানের সব মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বর্তমানে অধ্যয়নরত আফগান শিক্ষার্থীদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে পিএমডিসির কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। এ তথ্য জমা দেওয়ার জন্য তিন দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
পিএমডিসি একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা না দেওয়া, নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়া কিংবা কোনো তথ্য গোপন করার চেষ্টা করা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। প্রয়োজনে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
এই নির্দেশনা পাকিস্তানের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা কোনো নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি ও বেসরকারি—দেশটির সব মেডিক্যাল ও ডেন্টাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এটি কার্যকর হবে। ফলে পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে অধ্যয়নরত আফগান শিক্ষার্থীদের ওপর একই ধরনের বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে।
আফগান শিক্ষার্থীদের জন্য এই সিদ্ধান্তের মানবিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানে বসবাস করে পড়াশোনা করছেন। তাদের কেউ হয়তো শিক্ষা জীবনের মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছেন, কেউ আবার স্নাতক হওয়ার কাছাকাছি। হঠাৎ করে দেশে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ এলে তাদের শিক্ষা পরিকল্পনা, আবাসন, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার—সবকিছুই নতুন করে সাজাতে হতে পারে।
বিশেষ করে চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রে এক দেশের শিক্ষাক্রম থেকে অন্য দেশের শিক্ষাক্রমে সহজে স্থানান্তর সব সময় সম্ভব হয় না। পাঠ্যক্রম, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা পদ্ধতি, পেশাগত নিবন্ধন এবং ডিগ্রির স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকতে পারে। ফলে পাকিস্তানে শুরু করা পড়াশোনা আফগানিস্তানে ফিরে গিয়ে একই পর্যায় থেকে চালিয়ে নেওয়া যাবে কি না, সেটিও অনেক শিক্ষার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।
তবে পিএমডিসির সিদ্ধান্তের বিস্তারিত কারণ সম্পর্কে সরকারি চিঠিতে জাতীয় নীতির কথা বলা হলেও এর বাইরে বিস্তৃত ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। একইভাবে সিদ্ধান্তটি কতদিন বহাল থাকবে কিংবা ভবিষ্যতে আফগান শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত।
‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত রাখার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হলো সিদ্ধান্তটির নির্দিষ্ট মেয়াদ এখনো নির্ধারিত হয়নি। পরিস্থিতি ও নীতিগত সিদ্ধান্তের পরিবর্তনের ওপর এর পরবর্তী ধাপ নির্ভর করতে পারে।
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই নানা রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও সীমান্তসংক্রান্ত জটিলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দুই দেশের সম্পর্কের পরিবর্তন বিভিন্ন সময় শিক্ষা, বাণিজ্য, যাতায়াত ও অভিবাসনের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে আফগান শিক্ষার্থীদের মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষা নিয়ে পিএমডিসির সাম্প্রতিক নির্দেশনাকে ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের বিষয়ে যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একাডেমিক ধারাবাহিকতা এবং মানবিক বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা ইতোমধ্যে কোনো ডিগ্রি প্রোগ্রামে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু করেছেন, তাদের জন্য হঠাৎ পরিবর্তনের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের অর্জিত একাডেমিক ক্রেডিট, পরীক্ষার ফলাফল এবং ভবিষ্যৎ পেশাগত সুযোগ কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এদিকে পাকিস্তানের মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়ন একটি প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে। অল্প সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ, একাডেমিক অবস্থান যাচাই, পড়াশোনা স্থগিতের প্রক্রিয়া এবং স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের তথ্য নথিভুক্ত করার কাজ করতে হবে। পিএমডিসির নির্দেশনা অমান্য হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতা থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, পাকিস্তানে অধ্যয়নরত আফগান মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের পরবর্তী গন্তব্য কী হবে এবং তাদের অসমাপ্ত শিক্ষা কীভাবে এগোবে। পাশাপাশি যারা ভবিষ্যতে পাকিস্তানে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার পরিকল্পনা করছিলেন, তাদের জন্যও নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পিএমডিসির এই সিদ্ধান্তের ফলে পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় আফগান শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের উপস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে সিদ্ধান্তটি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং ভবিষ্যতে কোনো সংশোধিত নীতি বা বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। আপাতত সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আফগান শিক্ষার্থীদের মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত এবং নতুন ভর্তি বন্ধ থাকছে।