প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পাটপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে দেশের পাটের বাজার আরও শক্তিশালী হবে এবং এর সঙ্গে কৃষকরাও পাট চাষে বেশি আগ্রহী হবেন বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি মনে করেন, পাটের কাঁচামাল উৎপাদনের পাশাপাশি এর বহুমুখী ব্যবহার ও মূল্য সংযোজন বাড়াতে পারলে কৃষক থেকে শিল্প উদ্যোক্তা—সব পক্ষই লাভবান হতে পারে।
সোমবার রাজধানীর জেডিপিসি মিলনায়তনে আয়োজিত চীন-বাংলাদেশ টেক্সটাইল অ্যান্ড ফ্যাশন কনফারেন্সে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনে বাংলাদেশ ও চীনের টেক্সটাইল, ফ্যাশন এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের সহযোগিতা বাড়ানোর বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের পাটশিল্পের সম্ভাবনা এখনও অনেক বড়। দেশে পাট উৎপাদনের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের হলেও কাঁচা পাটের ওপর নির্ভর করে থাকলে কৃষক ও শিল্প—দুই পক্ষই কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাবে না। পাট থেকে তৈরি পণ্য যত বেশি উৎপাদন করা যাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা যত বেশি তৈরি করা সম্ভব হবে, ততই কাঁচা পাটের মূল্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল পাটকে শুধু কৃষিপণ্য হিসেবে না দেখে একটি সম্ভাবনাময় শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা। পাট থেকে সুতা, কাপড়, ব্যাগ, গৃহসজ্জার সামগ্রী, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংসহ নানা ধরনের পণ্য তৈরি করা সম্ভব। এসব পণ্যের বাজার দেশীয় পর্যায়ে যেমন বাড়ানো যায়, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাট ও পাটজাত পণ্যের সম্ভাবনাও নতুন করে সামনে এসেছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা বিভিন্ন দেশে চলছে। বাংলাদেশ সেই বৈশ্বিক পরিবর্তনের সুবিধা নিতে পারলে পাটশিল্পে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মন্ত্রী চীনের সঙ্গে সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, উৎপাদন অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের কাঁচামাল ও মানবসম্পদের সমন্বয় ঘটানো গেলে টেক্সটাইল ও ফ্যাশন খাতের সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব। যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে পাটপণ্যের উৎপাদন বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটবে, অন্যদিকে কৃষকও উৎপাদিত পাটের ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাট চাষের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক কৃষক সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। উৎপাদন খরচ, আবহাওয়া, বাজারদর এবং সংরক্ষণব্যবস্থার মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তাদের আয় নির্ভর করে। তাই পাটের বাজারে স্থিতিশীলতা তৈরি হলে কৃষকের জন্যও তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কৃষক পাটের ন্যায্য দাম পেলে উৎপাদন বাড়ানোর আগ্রহ দেখাবেন—মন্ত্রী মূলত সেই অর্থনৈতিক চক্রের কথাই তুলে ধরেছেন। শিল্পে পাটের ব্যবহার বাড়বে, পাটপণ্যের চাহিদা বাড়বে, এর ফলে কাঁচামালের প্রয়োজনও বাড়বে। চাহিদা বাড়লে উৎপাদক পর্যায়ে পাটের ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে শিল্পে মূল্য সংযোজন বাড়লে রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।
সম্মেলনে চীনে বাংলাদেশের পাটপণ্য রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। বিশ্বের অন্যতম বড় উৎপাদন ও ভোক্তা বাজার হিসেবে চীন বাংলাদেশের পাটপণ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার হয়ে উঠতে পারে। সেখানে বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের চাহিদা তৈরি করা গেলে রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন পণ্য নিয়ে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগও তৈরি হবে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে শুধু কাঁচামাল থাকলেই হবে না। পণ্যের গুণগত মান, নকশা, উৎপাদন প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। চীনের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আরও দক্ষতা অর্জন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, দুই দেশের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাতের রপ্তানি দ্বিগুণ করা সম্ভব। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রযুক্তি, দক্ষতা, গবেষণা এবং শিল্পের আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের পোশাক ও টেক্সটাইল খাত দীর্ঘদিন ধরে দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং নতুন প্রতিযোগীদের উত্থানের কারণে এই খাতকে ক্রমাগত নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হচ্ছে। প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি নতুন ধরনের টেক্সটাইল, পরিবেশবান্ধব উপকরণ এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের দিকে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের টেক্সটাইল সহযোগিতা নতুন মাত্রা পেতে পারে। চীনের বিশাল শিল্প অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে উভয় দেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সম্মেলনে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও সহযোগিতার কথা তুলে ধরা হয়। টেক্সটাইল খাতের উন্নয়নে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ও গবেষণা আদান-প্রদান করা হবে বলে জানান মন্ত্রী। এর মাধ্যমে শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরির পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী ধারণা নিয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
টেক্সটাইল শিল্পে প্রযুক্তির পরিবর্তন দ্রুত ঘটছে। স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট টেক্সটাইল, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং আধুনিক ডিজাইনের ব্যবহার ভবিষ্যতের বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো গেলে তরুণদের এসব নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করার সুযোগ বাড়বে।
পাটের ক্ষেত্রেও গবেষণার গুরুত্ব রয়েছে। পাটের আঁশের ব্যবহারকে আরও বহুমুখী করার পাশাপাশি উন্নত মানের পাটপণ্য তৈরির প্রযুক্তি, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো গেলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা সম্ভব। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ কাজে লাগাতে হলে গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিকল্প নেই।
চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের পাট ও টেক্সটাইল খাত যদি নতুন প্রযুক্তি ও বাজার সুবিধা পায়, তাহলে এর সুফল কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন শিল্প স্থাপন ও বিদ্যমান শিল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
তবে পাটের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন পর্যায়ে যদি কৃষক কাঙ্ক্ষিত দাম না পান, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে পাট চাষে আগ্রহ কমে যেতে পারে। তাই কৃষক ও শিল্পের মধ্যে কার্যকর বাজারসংযোগ গড়ে তোলা এবং পাটের মূল্য সংযোজনের সুফল উৎপাদক পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
চীন-বাংলাদেশ টেক্সটাইল অ্যান্ড ফ্যাশন কনফারেন্সে আলোচনার মধ্য দিয়ে দুই দেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনাগুলো সামনে এসেছে। পাটপণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি, টেক্সটাইল খাতের সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা ও গবেষণায় সহযোগিতা—এই তিনটি ক্ষেত্র ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্যে বাংলাদেশের পাটশিল্পকে কাঁচামালনির্ভর খাত থেকে মূল্য সংযোজন ও রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপান্তরের একটি সম্ভাব্য পথের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। উৎপাদন বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ এবং কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে পাট আবারও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। চীনের সঙ্গে সহযোগিতা সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।