এনসিটি-সিসিটি ইজারার প্রতিবাদে ৩১ আগস্ট বিক্ষোভ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ২১ বার
এনসিটি-সিসিটি ইজারার প্রতিবাদে ৩১ আগস্ট বিক্ষোভ

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) দেশি-বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগের প্রতিবাদে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বন্দর রক্ষা কমিটি। সংগঠনটি জানিয়েছে, আগামী ৩১ আগস্ট নগরের বারিক বিল্ডিং মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হবে। এর আগে টার্মিনাল দুটির ইজারা নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় ও জনসংযোগ কর্মসূচি পালন করবে তারা।

সোমবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের জুলাই হলে আয়োজিত নাগরিক কনভেনশন থেকে এসব কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কনভেনশনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি, শ্রমিক সংগঠনের নেতা, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সেখানে বক্তারা চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব এবং দেশের অর্থনীতিতে এর ভূমিকা তুলে ধরে টার্মিনাল ইজারার বিষয়ে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

বন্দর রক্ষা কমিটির নেতারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি বাণিজ্যিক স্থাপনা নয়; দেশের আমদানি-রপ্তানি, রাজস্ব আয়, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এর কার্যক্রম সরাসরি যুক্ত। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় একটি অংশ এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় এর অবকাঠামো ও পরিচালন ব্যবস্থার যেকোনো বড় পরিবর্তনের প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ কোনো টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়ার আগে এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক, সামাজিক ও কৌশলগত প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

কনভেনশনে বক্তারা বলেন, টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রে দক্ষতা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে বন্দর ব্যবস্থাপনায় কোনো পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে শুধু পরিচালন দক্ষতা বা বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করলে চলবে না। জাতীয় রাজস্ব, বন্দরের সক্ষমতা, শ্রমিকদের অধিকার, কর্মসংস্থান, ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থও সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।

বন্দর রক্ষা কমিটির সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল দেশি-বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত জনগণ মেনে নেবে না। তিনি বন্দর রক্ষার আন্দোলনে রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই বন্দরের সঙ্গে শুধু ব্যবসায়ী বা আমদানিকারক-রপ্তানিকারকদের স্বার্থ জড়িত নয়; বন্দরকেন্দ্রিক অসংখ্য মানুষের জীবিকা, পরিবহন খাত, শিল্পকারখানা এবং বিভিন্ন সেবা খাতও এর ওপর নির্ভরশীল। তাই বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ও মতামতকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বন্দর রক্ষা কমিটির ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ১৭ আগস্ট থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় ও জনসংযোগ করা হবে। এই সময়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে টার্মিনাল ইজারার সম্ভাব্য প্রভাব, বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা এবং জাতীয় স্বার্থের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মানুষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এরপর ৩১ আগস্ট বিক্ষোভ মিছিলের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিবাদ প্রকাশ করবে সংগঠনটি।

নাগরিক কনভেনশনে বক্তারা আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল দেশের কনটেইনার পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে এসব টার্মিনালের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এসব স্থাপনার ভবিষ্যৎ পরিচালনা কাঠামো নির্ধারণের আগে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার সঙ্গে বিষয়টি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষের জীবিকা জড়িত। টার্মিনাল পরিচালনায় কোনো ধরনের পরিবর্তন এলে শ্রমিকদের চাকরি, কর্মপরিবেশ, মজুরি, অধিকার এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ওপর কী প্রভাব পড়বে, সেটিও আলোচনার অংশ হওয়া প্রয়োজন বলে মত দেন বক্তারা। তাঁদের মতে, দক্ষতা বৃদ্ধির নামে এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়, যাতে দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের সঙ্গে যুক্ত শ্রমজীবী মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন।

চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির আলোচনা চলছে। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দরের ওপর চাপও বাড়ছে। কনটেইনার পরিবহন, পণ্য খালাস, জাহাজের অপেক্ষার সময় কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরও কার্যকর করার জন্য আধুনিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেই আধুনিকায়নের ধরন কী হবে এবং কারা বন্দর পরিচালনায় যুক্ত হবে, তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছে বন্দর রক্ষা কমিটি।

সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, বন্দর পরিচালনায় বেসরকারি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের প্রশ্নকে কেবল দক্ষতা বা বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে দেশের কৌশলগত সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়ও যুক্ত। তাই যেকোনো চুক্তি বা ইজারা দেওয়ার আগে এর শর্ত, মেয়াদ, রাজস্ব কাঠামো, পরিচালন ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।

কনভেনশনে অংশ নেওয়া বক্তারা আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের নামে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যা ভবিষ্যতে দেশের জন্য আর্থিক বা কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাঁদের মতে, বন্দরের উন্নয়ন হতে হবে স্বচ্ছতা, দক্ষতা, শ্রমিকের অধিকার এবং জাতীয় স্বার্থের সমন্বয়ে।

নাগরিক কনভেনশনে বন্দর ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক (ডা.) এম আবু সাঈদ, কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন, টিইউসি চট্টগ্রাম কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, এ এম নাজিম উদ্দিন, ডা. মাহফুজুর রহমান, জেসমিন সুলতানা পারুল এবং কমরেড অশোক সাহাসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন। তাঁরা বন্দর ও জাতীয় সম্পদের বিষয়ে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় বন্দরের যেকোনো সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু বন্দর এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, পরিবহন শ্রমিক এবং সাধারণ ভোক্তার ওপরও এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ে। বন্দরের কার্যক্রমে কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে, ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব বাজারেও পড়তে পারে।

এ কারণে বন্দর রক্ষা কমিটির ঘোষিত কর্মসূচি সামনে রেখে চট্টগ্রামে টার্মিনাল ইজারা নিয়ে আলোচনা আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের জনসংযোগ ও মতবিনিময় কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিক্রিয়া নেওয়ার পাশাপাশি ৩১ আগস্টের বিক্ষোভে বৃহত্তর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে সংগঠনটি।

তবে টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং বন্দর রক্ষা কমিটির আপত্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী অবস্থান নেয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে নাগরিক কনভেনশন থেকে ঘোষিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বন্দর ইজারা প্রশ্নে চট্টগ্রামে নতুন করে জনমত গড়ে তোলার উদ্যোগ শুরু হলো।

চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ পরিচালনা ও উন্নয়ন নিয়ে যে কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, রাজস্ব, শ্রমিকের অধিকার এবং বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বন্দর রক্ষা কমিটির ঘোষিত কর্মসূচি সেই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত