কার্গো খালাসে এআই, বাড়ছে বিমানবন্দরের সক্ষমতা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৮ বার
কার্গো খালাসে এআই, বাড়ছে বিমানবন্দরের সক্ষমতা

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিমানবন্দরে আমদানি-রপ্তানি পণ্য দ্রুত খালাস এবং কার্গো ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের জটিলতা কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কার্গো সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে অস্থায়ী ও স্থায়ী ওয়্যারহাউস নির্মাণ, সংবেদনশীল পণ্যের জন্য কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বিমানবন্দরে পণ্য খালাসের সময় কমার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি বাড়তে পারে।

সোমবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বিমানবন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং সমস্যা নিরসনে আয়োজিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সভায় অংশ নেন।

সভায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশ শুধু অন্যদের অনুসরণ করতে চায় না, বরং নেতৃত্বের অবস্থানে যেতে চায়। বিমানবন্দরের কার্গো ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দেশের এভিয়েশন খাতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিমানবন্দরে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে সময়, জায়গা এবং ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা ব্যবসায়ীদের জন্য দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। আমদানি করা পণ্য বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তা যথাসময়ে শনাক্ত, সংরক্ষণ, পরীক্ষা ও খালাস করা সম্ভব না হলে একদিকে যেমন ব্যবসায়ীদের ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায়ও চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এমন পণ্য কিংবা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ প্রয়োজন এমন পণ্যের ক্ষেত্রে সময়মতো খালাস আরও গুরুত্বপূর্ণ।

এই বাস্তবতায় সভায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব গুরুত্ব পেয়েছে। বিমানবন্দরে আমদানিকৃত কার্গো সহজে শনাক্ত এবং দ্রুত খুঁজে বের করার জন্য এআইভিত্তিক একটি মডেল তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রযুক্তিটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বিশাল পরিমাণ পণ্যের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট চালান শনাক্ত করার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও নির্ভুল হতে পারে।

কার্গো পণ্য আমদানির নোটিশ দ্রুত আমদানিকারকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিও সভায় গুরুত্ব পেয়েছে। আমদানিকারক সময়মতো পণ্য আসার তথ্য জানতে পারলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা আগেই সম্পন্ন করার সুযোগ পাবেন। এতে পণ্য বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর খালাসের প্রক্রিয়ায় বিলম্ব কমানো সম্ভব হতে পারে।

কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতেও একাধিক উদ্যোগের কথা আলোচনা হয়েছে। সভায় অস্থায়ী একটি ওয়্যারহাউস নির্মাণের জন্য সাতটি সম্ভাব্য স্থান এবং স্থায়ী ওয়্যারহাউস নির্মাণের জন্য চারটি সম্ভাব্য স্থান নিয়ে আলোচনা করা হয়। দ্রুত প্রয়োজন মেটাতে অস্থায়ী অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরির জন্য স্থায়ী অবকাঠামো—দুই দিকেই এগোনোর প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে।

ওয়্যারহাউসের পাশাপাশি ওষুধসহ সংবেদনশীল পণ্য আমদানি ও রপ্তানির জন্য কোল্ড স্টোরেজ অবকাঠামো তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও পরিবেশে সংরক্ষণ প্রয়োজন এমন পণ্যের ক্ষেত্রে উপযুক্ত অবকাঠামো না থাকলে গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে বিমানবন্দরে আধুনিক কোল্ড চেইন সুবিধা গড়ে তোলা হলে ওষুধ ও অন্যান্য তাপমাত্রা-সংবেদনশীল পণ্যের বাণিজ্য আরও সহজ হতে পারে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী সভায় বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে আরও নিরাপদ, আধুনিক ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের কাজ চলছে। প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের কারিগরি ও অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সহজ করা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, শুধু একটি সংস্থার উদ্যোগে বিমানবন্দরের কার্গো ব্যবস্থাপনার সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। অবকাঠামো, কাস্টমস কার্যক্রম, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রমের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বিমানবন্দরের অবকাঠামো তৈরি ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। অন্যদিকে কাস্টমসের মূল দায়িত্ব হলো আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের বৈধতা, প্রয়োজনীয় ঘোষণা, কাগজপত্র এবং শুল্কসংক্রান্ত বিষয় নিশ্চিত করা। ওয়্যারহাউস নির্মাণ ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা কাস্টমসের মূল দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে দেওয়া হলে কাস্টমস সেখানে নিয়ম অনুযায়ী তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। তাই কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়াতে অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান করা জরুরি।

বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, বিষয়টি সরাসরি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত না হলেও দেশের আমদানি-রপ্তানি ও সামগ্রিক বাণিজ্য কার্যক্রমের সঙ্গে এটি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আধুনিক ও কার্যকর কার্গো ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে সমস্যা সমাধানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।

কার্গো ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা প্রয়োজন। বিমানপথে পরিবহন করা পণ্যের ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্ব আরও বেশি। ফলে বিমানবন্দরে পণ্য খালাসে বিলম্ব কমানো গেলে রপ্তানিকারকদের সময় ও ব্যয় উভয় ক্ষেত্রেই সুবিধা হতে পারে।

সভায় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য একটি নির্দেশিকা তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। কার্যকর নির্দেশিকা থাকলে দায়িত্ব বণ্টন, কাজের ধাপ, জবাবদিহি এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় আরও সুস্পষ্ট করা সম্ভব হবে। এতে কার্গো ব্যবস্থাপনায় অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়নকে সমন্বিত করার বিষয়টিও সভার আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। শুধু এআই প্রযুক্তি চালু করলেই কার্গো খালাসের সব সমস্যা দূর হবে না। পর্যাপ্ত ওয়্যারহাউস, কোল্ড স্টোরেজ, দক্ষ জনবল, দ্রুত কাগজপত্র যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ও একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। এসব ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে প্রযুক্তির সুফলও বেশি পাওয়া সম্ভব।

বিমানবন্দরে কার্গো ব্যবস্থাপনা উন্নত হলে এর সুফল শুধু ব্যবসায়ী বা আমদানিকারকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দ্রুত পণ্য খালাসের মাধ্যমে শিল্পের কাঁচামাল দ্রুত উৎপাদনকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে, রপ্তানি পণ্য নির্ধারিত সময়ে বিদেশে পাঠানো সহজ হতে পারে এবং ওষুধসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাও আরও গতিশীল হতে পারে।

সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতার, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়িত হলে বিমানবন্দরের কার্গো খালাস প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের ধীরগতি কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব সুফল নির্ভর করবে পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন, অবকাঠামো নির্মাণের গতি, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর। ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়াতে বিমানবন্দরের কার্গো ব্যবস্থাপনায় এই পরিবর্তন তাই গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত