প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও ইউটিলিটি—জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ অনুভব করছেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার জন্য আগের তুলনায় বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলো।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) প্রতিদিন ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন বাজার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সংগ্রহ করে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। কয়েকটি পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও অনেক পণ্যের মূল্য অপরিবর্তিত রয়েছে।
বিশেষ করে ভোজ্যতেল, লবণ, আটা, ডাল, আলু, রসুন, ডিম ও গুঁড়া দুধসহ বেশ কয়েকটি খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। একই সময়ে মৌসুমি পরিবর্তনের কারণে কাঁচা সবজির দামও বেড়েছে। চালের বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও অন্যান্য নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের সামগ্রিক ব্যয়ের চাপ কমাতে পারেনি।
খাদ্যপণ্যের বাইরে জীবনযাত্রার ব্যয়ের আরেকটি বড় চাপ এসেছে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও অন্যান্য সেবার খাত থেকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতির তথ্যেও এ চাপের প্রতিফলন রয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে পণ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার যে প্রভাব বাংলাদেশে পড়েছিল, তার পুরোপুরি অবসান হয়নি। এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে। একসময় প্রতি ডলারের দাম যেখানে ৮৬ টাকার আশপাশে ছিল, তা এখন প্রায় ১২৩ টাকায় উঠেছে। ফলে আমদানিনির্ভর পণ্য ও শিল্পের কাঁচামালের ব্যয়ও বেড়েছে।
এই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ছে। আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পণ্যের পাইকারি ও খুচরা বাজারেও।
এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন করে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিকল্প উৎস থেকে তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যয়, পরিবহন ভাড়া এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচে। শেষ পর্যন্ত এসব ব্যয়ের চাপ এসে যুক্ত হচ্ছে পরিবারের মাসিক বাজেটে।
ফলে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতায় স্বস্তি ফিরছে না। কারণ মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং দাম আগের তুলনায় ধীরগতিতে বাড়ছে। ফলে কয়েক মাস বা কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে যে ব্যয়স্তর তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে জীবনযাত্রার চাপ থেকেই যায়।
মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি নেই
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে বাজারে বাড়তি চাহিদা ছিল। একই সময়ে বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়েও নানা প্রশ্ন ওঠে। ফলে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে উঠে যায়।
পরবর্তী সময়ে কিছু পণ্যে শুল্কছাড়, নতুন ফসলের সরবরাহ এবং বাজারের পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে। কিন্তু ভোক্তাদের ব্যয়ের চাপ কমেনি।
টিসিবির বাজারদরের তথ্যেও এর একটি চিত্র পাওয়া যায়। ফেব্রুয়ারির তুলনায় মোটা ও সরু চালের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে এবং মাঝারি মানের চালের দাম কিছুটা কমেছে। কিন্তু একই সময়ে বেশ কিছু খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে।
সরকারি ভর্তুকিতে ট্রাকে করে পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তি তৈরি করছে। তবে সরবরাহ সীমিত হওয়ায় এসব পণ্য পেতে অনেককে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এগুলোর কার্যক্রম এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যাতে সামগ্রিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে সংকট
অর্থনীতিবিদদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি শুধু বাজারে পণ্যের দাম দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, ঋণের সুদ, উৎপাদনশীলতা এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা—সবকিছু মিলেই ভোক্তার ওপর চাপ তৈরি করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের পর এলপিজি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাবও সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে সামাল দিতে হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও মাসিক বাজেটের বড় অংশ আগের চেয়ে বেশি ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়া এবং বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল হওয়ার পরও পণ্যের দাম কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমেনি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধিও বাজারে প্রভাব ফেলেছে।
তার মতে, মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য সম্প্রসারণমূলক আর্থিক ও মুদ্রানীতি নেওয়া হলে তা মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রচেষ্টার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতিগত সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, একদিকে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নেওয়া হলেও অন্যদিকে ঋণের সুদ কমানো, ব্যাংক খাতে অর্থ সরবরাহ বাড়ানো এবং বড় আকারের সরকারি তহবিল গঠন মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ধীরগতিও মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে। আয় না বাড়লে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও পরিবারের বাজেটে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে।
বাণিজ্যমন্ত্রীও সন্তুষ্ট নন
সরকারের পক্ষ থেকেও বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্টির কথা বলা হয়নি। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির বলেছেন, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও দ্রব্যমূল্যের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন।
তার মতে, পণ্যের দাম কমানো শুধু বাজার তদারকির বিষয় নয়। এর সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম, ঋণের সুদ, উৎপাদনশীলতা, পরিবহন এবং অবকাঠামোর মতো বিষয় সরাসরি যুক্ত।
বাংলাদেশে লজিস্টিক ব্যয় আন্তর্জাতিক গড়ের তুলনায় বেশি হওয়ায় পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়ে। ফলে উৎপাদক বা আমদানিকারকের কাছ থেকে পণ্য যখন ভোক্তার কাছে পৌঁছায়, তখন তার দামে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী মনে করেন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি এবং দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে পণ্যের দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এর জন্য তাৎক্ষণিক ফলের পরিবর্তে অবকাঠামো ও জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
নতুন এলএনজি অবকাঠামো, গ্যাস সরবরাহ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সংকট এখন কেবল বাজারদরের সমস্যা নয়। মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, জ্বালানি ব্যয়, আমদানি খরচ, পরিবহন ব্যবস্থা এবং সরকারি নীতির সমন্বিত প্রভাবেই এই চাপ তৈরি হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির হার কমানোর পাশাপাশি মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে না পারলে সাধারণ পরিবারের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ দ্রুত কমবে না।