প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে বাড়িতে ঢুকে ২১ বছর বয়সী এক বাকপ্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে এক প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে। ঘটনার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি পালিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর করা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ঘটনাটি ঘটেছে গত রোববার উপজেলার পাইকেরছড়া ইউনিয়নে। ভুক্তভোগী ওই তরুণী স্বামীকে হারানোর পর বাবার বাড়িতে বসবাস করছিলেন বলে জানা গেছে। ঘটনার দিন দুপুরে তিনি বাড়ির একটি কক্ষে একা ছিলেন। এ সময় একই এলাকার শাহাদৎ হোসেন সেখানে প্রবেশ করেন বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তরুণীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি ভুক্তভোগীর মুখ চেপে ধরেন এবং পরে তাঁকে হত্যার হুমকি দিয়ে চলে যান। বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় ঘটনার পরপরই নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিষয়টি অন্যদের জানাতে ভুক্তভোগীর জন্য আরও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি মায়ের কাছে ঘটনার বিষয়টি জানান। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে থানায় নিয়ে গিয়ে লিখিত অভিযোগ করেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাটি তদন্তে নেয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। ঘটনার পর অভিযুক্ত শাহাদৎ হোসেন এলাকায় নেই বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য সিরাজুল ইসলাম বাবু ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, অভিযোগ ওঠার পর ভুক্তভোগীর পরিবারকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ঘটনার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি পালিয়ে গেছেন।
ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজিম উদ্দিন জানান, ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পুলিশ ঘটনাটির বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে।
একজন বাকপ্রতিবন্ধী তরুণীর সঙ্গে এমন অভিযোগের ঘটনায় স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শারীরিক বা যোগাযোগগত প্রতিবন্ধকতার কারণে কোনো ব্যক্তি অপরাধের শিকার হলে তা দ্রুত প্রকাশ করা, সহায়তা চাওয়া কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে বাড়তি প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে এমন ঘটনায় পরিবারের সদস্য, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও চিকিৎসাসেবার সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে একই সময়ে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় ২০ মাস বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মরম আলী নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভয়াবহ এই ঘটনায় শিশুটির মা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ঘটনার সময় দেখতে পান বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায়। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
ঘটনাটি ঘটে গত রোববার সকাল ১১টার দিকে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, মরম আলী প্রতিবেশী ২০ মাস বয়সী শিশুটিকে নিজের ঘরে নিয়ে যান। কিছু সময় পর শিশুটির মা সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি দেখতে পেয়ে চিৎকার শুরু করেন। তখন অভিযুক্ত ব্যক্তি পালিয়ে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরে শিশুটিকে উদ্ধার করে প্রথমে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে শিশুটির চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় শিশুটির বাবা সোমবার রাতে ছাতক থানায় মামলা করেন। মামলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে মধ্যরাতে মরম আলীকে গ্রেপ্তার করে। মঙ্গলবার দুপুরে তাঁকে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, শিশুটির বাবার করা মামলার ভিত্তিতে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
একই দিনে দেশের দুই অঞ্চলে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার অভিযোগের ঘটনায় নিরাপত্তা ও সামাজিক সচেতনতার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অভিযোগের প্রতিটি বিষয় তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়াই আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা এবং তাঁর প্রতি সামাজিক সংবেদনশীলতা বজায় রাখাও জরুরি। অপরাধের শিকার ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর সামাজিক চাপ, অপমান কিংবা দোষারোপের পরিবর্তে তাদের আইনি সহায়তা, চিকিৎসা ও মানসিক সমর্থন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনগত তদন্ত যথাযথভাবে সম্পন্ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কুড়িগ্রামের ঘটনায় এখন মূল নজর অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার এবং তদন্তের অগ্রগতির দিকে। একইভাবে সুনামগঞ্জের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়া সামনে এগোবে। দুটি ঘটনাতেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্ত, ভুক্তভোগী ও পরিবারের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নয়; পরিবার, স্থানীয় সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। কোনো ব্যক্তি ঝুঁকিতে থাকলে তাঁর পাশে দাঁড়ানো, সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং অপরাধের ঘটনা গোপন না রেখে আইনি সহায়তা নেওয়া অপরাধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে।
কুড়িগ্রাম ও সুনামগঞ্জের পৃথক দুই ঘটনার পর আবারও স্পষ্ট হয়েছে, সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়। অপরাধ প্রতিরোধ, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, ভুক্তভোগীবান্ধব চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা এবং কার্যকর বিচার—সবগুলো ধাপ সমান গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের প্রতি মানবিক আচরণ বজায় রেখে এমন ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব।