আদমজী ইপিজেড থেকে বছরে ৯৮ মিলিয়ন ডলারের স্যুট রপ্তানি

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) উৎপাদিত পুরুষদের স্যুট, ব্লেজার ও অন্যান্য পোশাক এখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বাজারে যাচ্ছে। রোমানিয়া-বাংলাদেশের যৌথ বিনিয়োগে গড়ে ওঠা ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার লিমিটেড বছরে প্রায় ৫০ লাখ পিস পুরুষদের পোশাক উৎপাদন করছে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় ৯৮ মিলিয়ন ডলার।

বেপজার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার লিমিটেড ৯৭ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। কারখানাটিতে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৫ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে এখানে ৫ হাজার ৬৯৯ জন বাংলাদেশি এবং ৪০ জন বিদেশি কর্মী কাজ করছেন।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় স্যুট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতার জন্য টেইলর্ড স্যুট, ব্লেজার, ফরমাল ট্রাউজার, ওয়েস্টকোট ও জ্যাকেট তৈরি করে। কারখানাটির উৎপাদিত পোশাক ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

কারখানাটিতে ঢুকলেই দেখা যায় বড় পরিসরে উৎপাদন কার্যক্রম। কোথাও কাপড় কাটা হচ্ছে, কোথাও চলছে সেলাই। অন্যদিকে কর্মীরা ব্লেজার ও ট্রাউজার প্রেসিং, ফিনিশিং এবং প্যাকেজিংয়ের কাজ করছেন। উৎপাদনের শেষ ধাপে পোশাকগুলো হ্যাঙ্গারে সাজিয়ে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।

ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার লিমিটেডের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, এইচআর অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স) মো. বিল্লাল হোসেন জানান, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জন্য পুরুষদের স্যুট, ব্লেজার ও ট্রাউজার তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। রোমানিয়ার অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে কারখানাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। উৎপাদন কার্যক্রমে রোমানিয়া থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আনা হয়েছে।

২০১২ সালে কারখানাটিতে উৎপাদন ও প্রথম রপ্তানি শুরু হয়। ব্যবসা সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী সময়ে উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে কারখানাটির মোট ফ্লোর স্পেস প্রায় ৫ লাখ ৩৫ হাজার বর্গফুট। এখানে আধুনিক কাটিং, সেলাই, প্রেসিং, ফিনিশিং ও প্যাকেজিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পোশাক তৈরি করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটির মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫ লাখ পিস। প্যান্ট, ট্রাউজার, ব্লেজার ও পুরুষদের অন্যান্য পোশাক মিলিয়ে বছরে প্রায় ৫০ লাখ পিস উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তৈরি পোশাকের একটি অংশের মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে। আবার আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জন্য ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত মূল্যের স্যুটও উৎপাদন করা হয়েছে।

ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যারের তৈরি পোশাকের ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে এইচঅ্যান্ডএম, জারা ম্যান, জারা কিডস, মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার, সিঅ্যান্ডএ, প্রাইমার্ক, এএসওএস, জ্যাক অ্যান্ড জোনস, বেন শেরম্যান, মস ব্রস গ্রুপ, ডানস স্টোরস, কিউবাস, হ্যাগার ক্লোদিং, ডোবেল ও পিয়ারলেস ক্লোদিং ইন্টারন্যাশনালের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও রিটেইলার।

উৎপাদনে ব্যবহৃত অধিকাংশ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি। স্থানীয়ভাবে সীমিত কিছু উপকরণ, বিশেষ করে প্যাকেজিংয়ের কার্টন সংগ্রহ করা হয়।

আদমজী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে ইপিজেডটিতে বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়ছে।

বেপজার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আদমজী ইপিজেডের ৪৭টি প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে ১ দশমিক ১৭৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বর্তমানে নির্মাণাধীন আরও ১০টি কারখানা উৎপাদনে এলে ইপিজেডটির বার্ষিক রপ্তানি ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যারের কার্যক্রম শুধু রপ্তানি আয় ও উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানটি কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতেও সহায়তা করছে।

কারখানাটিতে কর্মরত সুরভী প্রায় তিন বছর ধরে সেখানে কাজ করছেন। তার ভাষ্য, কর্মপরিবেশ ভালো এবং কর্মীরা সময়মতো ছুটি পান। অন্যদিকে এইচএসসি পাস করে কারখানায় যোগ দেওয়া মোহাম্মদ বাইজিদ বর্তমানে ব্লেজার আয়রনের কাজ করেন। তার মূল বেতন ১৪ হাজার ৯০০ টাকা হলেও ওভারটাইমসহ মাসিক আয় প্রায় ২৩ হাজার টাকা বলে জানান তিনি।

কর্মীদের উন্নয়নের আরেকটি উদাহরণ জান্নাতুল ফেরদৌস। উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে তিনি ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যারে রিসেপশনিস্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। চাকরির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং পাঁচ বছরে উচ্চশিক্ষা শেষ করেন।

পড়াশোনা শেষে গত মাসে তিনি আবারও একই প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। তবে এবার রিসেপশনিস্ট হিসেবে নয়, অ্যাসিস্ট্যান্ট মার্চেন্ডাইজার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। অর্থাৎ যে প্রতিষ্ঠানে একসময় তিনি রিসেপশনে বসে কাজ করতেন, সেখানেই এখন পোশাকের অর্ডার, ক্রেতা এবং উৎপাদন-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করছেন।

পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির কিছু উদ্যোগ রয়েছে। কারখানাটি ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএসজিবিসি) লিড গোল্ড সনদ পেয়েছে। পাশাপাশি কারখানায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থাও রয়েছে।

বিল্লাল হোসেনের মতে, আদমজী ইপিজেডে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য ইউটিলিটি সেবা পাওয়ায় কারখানা পরিচালনায় সুবিধা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইপিজেড কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা ও তদারকি ব্যবস্থাও বিনিয়োগকারীদের জন্য সহায়ক।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস। প্রচলিত শার্ট, টি-শার্ট ও ট্রাউজারের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের স্যুট ও ফরমাল পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হওয়ায় দেশের পোশাকশিল্পের পণ্যে বৈচিত্র্যও বাড়ছে। আদমজী ইপিজেডের ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যারের কার্যক্রম সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৯৮ মিলিয়ন ডলারের বার্ষিক রপ্তানি আয় যেমন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে অবদান রাখছে, তেমনি এর প্রায় ৫ হাজার ৭০০ বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানও স্থানীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য উচ্চমানের স্যুট উৎপাদন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের উচ্চমূল্যের বাজারে অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত