বন্ধ ৩ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার ডেমরায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস লিমিটেড ও করিম জুট মিলসের জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একইভাবে কুষ্টিয়া সুগার মিলসের জমিতেও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) জানিয়েছে, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত এসব শিল্পসম্পদকে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, শিল্প স্থাপন এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আগস্টে অনুষ্ঠিত বেজা গভর্নিং বোর্ডের সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট তিন প্রতিষ্ঠানের জমি বেজার কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে সেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও বিনিয়োগ কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

বেজার কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। বন্ধ শিল্পকারখানার জমিকে নতুন করে উৎপাদন ও বিনিয়োগের কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলকে (ইপিজেড) একটি সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ডেমরায় ১৩৩ একর জমি

ক্রমাগত লোকসানের কারণে ডেমরার লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস ও করিম জুট মিলস ২০০০ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে। কারখানা দুটি যথাক্রমে ১৯৫৩ ও ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৭২ সালে এগুলো বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে নেওয়া হয়।

করিম জুট মিলসের প্রায় ৫০ একর এবং লতিফ বাওয়ানী জুট মিলসের প্রায় ৮৩ একর জমি রয়েছে। অর্থাৎ দুটি কারখানার মোট ১৩৩ একর জমি নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

সরকারের প্রত্যাশা, এসব জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা হলে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত শিল্পসম্পদ আবারও উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রে পরিণত হবে।

কুষ্টিয়া সুগার মিলসের ২২০ একর জমি

কুষ্টিয়া সুগার মিলসের ২২০ একর জমিতেও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।

১৯৬৫-৬৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠিত কুষ্টিয়া সুগার মিলস শুরুর দিকে কয়েক বছর লাভে থাকলেও ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে ধারাবাহিক লোকসানে পড়ে। দীর্ঘদিনের লোকসানের পর ২০২০ সালে মিলটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

মিলটির শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকায় ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে। কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর মিলটি পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এবার মিলটির ২২০ একর জমিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বেজার নির্বাহী সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) সালেহ আহমেদ বলেন, জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন করা হবে, তা নিয়ে কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে আদমজী জুট মিলের উদাহরণ বিবেচনা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, বন্ধ মিলগুলোর বকেয়া দায়দেনা নিষ্পত্তির পর জমি হস্তান্তরের বিষয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের আওতায় আসতে পারে

বেজার কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো ভবিষ্যতে পরিকল্পিত ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের অধীনে আসতে পারে।

দেশের একক বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ গঠনের লক্ষ্যে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে। আইনের আওতায় বেজা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বিলুপ্ত করে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ নামে একটি একক সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান গঠনের কথা রয়েছে।

আইনে শিল্পাঞ্চল বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান হস্তান্তর ও গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারের গভর্নিং বোর্ডের সঙ্গে পরামর্শ করে অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা শিল্প এলাকা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যস্ত করা যাবে।

একইভাবে কর্তৃপক্ষের কোনো শিল্পাঞ্চল বা সেখানে স্থাপিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান উন্নয়ন, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার কাছেও হস্তান্তর করা সম্ভব হবে।

ফলে বন্ধ কারখানার জমিতে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো ভবিষ্যতে একটি সমন্বিত বিনিয়োগ উন্নয়ন কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

আদমজী ইপিজেডের সাফল্য সামনে

বন্ধ শিল্পসম্পদকে কীভাবে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে পরিণত করা যায়, তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ আদমজী ইপিজেড।

স্বাধীনতার পর আদমজী জুট মিল জাতীয়করণ করে বিজেএমসির ব্যবস্থাপনায় আনা হয়। দীর্ঘদিনের লোকসান, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ক্রমে সংকটে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০০২ সালের ৩০ জুন মিলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

নিষ্ক্রিয় জুট মিল এলাকায় বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ফিরিয়ে আনা এবং জমি ও স্থাপনাকে উৎপাদনমুখী ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাজে ব্যবহারের লক্ষ্যে ২০০৪ সালের ১ ডিসেম্বর মিলের জমি বেপজার কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরপর ২০০৬ সালে আদমজী ইপিজেড আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।

তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২৯২ দশমিক ৬২ একর আয়তনের আদমজী ইপিজেডে ২৭৬টি শিল্প প্লট রয়েছে। সেখানে ৪৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইপিজেডটিতে ৮৪৭ দশমিক ০৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে।

এখানে পোশাক, টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিকস, বৈদ্যুতিক পণ্য, জুতা, সেফটি জ্যাকেট, স্যুট, ব্লেজারসহ বিভিন্ন ধরনের রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। জাপানি গাড়ির সিট কাভারসহ উচ্চমূল্যের বিভিন্ন পণ্যও উৎপাদন করা হচ্ছে।

বর্তমানে আদমজী ইপিজেডে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের লোকসানি ও বন্ধ শিল্পাঞ্চলের জমিকে পরিকল্পিত শিল্পায়নের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রে রূপান্তরের ক্ষেত্রে এটি সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

ডেমরা ও কুষ্টিয়ার বন্ধ কারখানার জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও সেই মডেল অনুসরণ করে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জমি হস্তান্তর, দায়দেনা নিষ্পত্তি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত এসব শিল্পসম্পদ নতুন বিনিয়োগের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত