রুশ জেনারেলের হুঁশিয়ারি, বিলীন হতে পারে ইসরায়েল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার
রুশ জেনারেলের হুঁশিয়ারি, বিলীন হতে পারে ইসরায়েল

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন রাশিয়ার এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, পশ্চিমা মিত্রদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে ইসরায়েল যে কৌশল অনুসরণ করছে, তা শেষ পর্যন্ত দেশটির জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এমনকি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই মন্তব্য করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল অপটি আলাউদিনভ। তিনি রুশ সশস্ত্র বাহিনীর মেইন মিলিটারি-পলিটিক্যাল ডিরেক্টরেটের ডেপুটি চিফ এবং ‘আখমাত’ স্পেশাল ফোর্সেস ইউনিটের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সামরিক পরিস্থিতি এবং সংঘাতের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি ইসরায়েলের কৌশল ও পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকা নিয়ে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন।

আলাউদিনভের বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত কেবল একটি সীমিত সামরিক সংঘর্ষ হিসেবে থাকবে না; বরং এর পরিধি আরও বাড়তে পারে। তিনি মনে করেন, যুদ্ধের মাত্রা বাড়ানোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর অন্যান্য সদস্যকে সরাসরি সংঘাতে যুক্ত করার চেষ্টা ইসরায়েলের কৌশলের অংশ হতে পারে। তার এই মন্তব্য মূলত বর্তমান আঞ্চলিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রতিফলিত করে।

রুশ এই জেনারেলের দাবি, ইসরায়েল পশ্চিমা সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করছে। তার মতে, এই নির্ভরতা দেশটির নেতৃত্বকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে। সংঘাত যত দীর্ঘায়িত ও বিস্তৃত হবে, ততই পরিস্থিতি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

আলাউদিনভ বলেন, ইসরায়েল যদি মনে করে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সমর্থন সব পরিস্থিতিতে তাদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, তাহলে সেটি বড় ধরনের ভুল হিসাব হতে পারে। কারণ কোনো আঞ্চলিক সংঘাত যখন একাধিক শক্তিধর রাষ্ট্রকে সরাসরি জড়িয়ে ফেলে, তখন তার পরিণতি আগাম অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তার সবচেয়ে কঠোর সতর্কবার্তাটি ছিল ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব নিয়ে। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আরও বেসামাল হলে এবং সংঘাতের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছালে যেখানে একাধিক পক্ষ সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে, তখন ইসরায়েল নিজের শক্তি সম্পর্কে ভুল মূল্যায়নের ফল ভোগ করতে পারে। তার ভাষায়, এর চূড়ান্ত পরিণতিতে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

তবে রুশ জেনারেলের এই বক্তব্যকে তার ব্যক্তিগত বা রাশিয়ার রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন মন্তব্য কোনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পূর্বাভাস নয়। বরং এটি চলমান সংঘাতের বিষয়ে রাশিয়ার একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার কঠোর রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্যায়ন। ফলে তার বক্তব্যকে সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি সতর্কতা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার কোনো নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখা যায় না।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক রাজনীতির অন্যতম বড় সংকট হিসেবে রয়েছে। ইসরায়েল ও তার প্রতিপক্ষদের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা, বিভিন্ন দেশে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের সমর্থন যুক্ত হওয়ায় সংঘাতের আন্তর্জাতিক মাত্রা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে সিরিয়ায় রুশ সামরিক উপস্থিতি এবং ইরানের সঙ্গে মস্কোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো বড় সামরিক সংঘাত রাশিয়ার কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে যায়। ফলে অঞ্চলটিতে সংঘাতের বিস্তার নিয়ে রুশ কর্মকর্তাদের মন্তব্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছেও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আলাউদিনভের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ন্যাটোর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে তার উদ্বেগ। কোনো আঞ্চলিক সংঘাতে ন্যাটোর সদস্যরা সরাসরি সামরিকভাবে যুক্ত হলে সেটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সংকট হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সংঘাতের প্রভাব আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার, বাণিজ্যিক নৌপথ এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর সম্পর্কেও পড়তে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো পরোক্ষভাবে একই সংঘাতের বিপরীত পক্ষে অবস্থান নিলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের জন্যও যুদ্ধের প্রভাব সবচেয়ে গভীর। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারাচ্ছেন, নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন এবং খাদ্য, চিকিৎসা ও মৌলিক প্রয়োজনীয়তার সংকটে পড়ছেন। সামরিক শক্তির পাল্টাপাল্টি প্রদর্শনের বাইরে যুদ্ধের এই মানবিক মূল্যই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। সংঘাত যত দীর্ঘ হয়, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও তত বাড়তে থাকে।

রুশ জেনারেলের বক্তব্যে তাই কেবল ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের বিষয় নয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও ফুটে উঠেছে। তার আশঙ্কা অনুযায়ী, কোনো পক্ষ যদি সংঘাতের মাত্রা বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে আরও বড় শক্তির সরাসরি অংশগ্রহণে বাধ্য করে, তাহলে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত কতটা বিস্তৃত হবে এবং বড় শক্তিগুলো কতটা সরাসরি এতে যুক্ত হবে। কারণ একটি সীমিত সংঘাত ও বৃহৎ আঞ্চলিক যুদ্ধের মধ্যে পার্থক্য অত্যন্ত গভীর। দ্বিতীয় পরিস্থিতি তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতেই নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে।

আলাউদিনভের মন্তব্য সেই সম্ভাব্য ঝুঁকির দিকেই ইঙ্গিত করেছে। যদিও তার বক্তব্যে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি অত্যন্ত কঠোর ও রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত একটি মন্তব্য, তবুও এর মধ্য দিয়ে চলমান সংঘাতের ভয়াবহতা সম্পর্কে রাশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মূল্যায়ন সামনে এসেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করা সম্ভব হবে কি না, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের বড় প্রত্যাশা। কারণ যুদ্ধের বিস্তার যত বাড়বে, ততই সামরিক বিজয়ের পাশাপাশি মানবিক বিপর্যয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়তে থাকবে। আর সেই কারণেই রুশ জেনারেলের সতর্কবার্তা নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনাকে উসকে দিয়েছে

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত