কাগজে দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র, বাস্তবে নেই কার্যক্রম

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রান্তিক খামারিদের কাছ থেকে ন্যায্য দামে দুধ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য নেওয়া প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দুই কোটি ৬১ লাখ টাকা সরকারি সহায়তায় ডেইরি হাব ও ভিলেজ মিল্ক কালেকশন সেন্টার স্থাপনের কথা থাকলেও অনুসন্ধানে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রমের দৃশ্যমান অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন স্থানে শুধু সাইনবোর্ড ঝোলানো এবং কিছু যন্ত্রপাতি রাখার মধ্যেই প্রকল্পের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকার অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের (এলডিডিপি) অন্যতম লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ খামারিদের উৎপাদিত দুধ ন্যায্যমূল্যে সংগ্রহ, মান যাচাই ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। এর মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং খামারিদের আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা ছিল।

প্রকল্পের আওতায় ত্রিশালে উদ্যোক্তা হিসেবে দায়িত্ব পান ভালুকা উপজেলার ধলিয়া গ্রামের আতিকুল্লাহ বাহার। তাঁর বিরুদ্ধে অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আতিকুল্লাহ বাহার বলেছেন, প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দুই কোটি ৬১ লাখ টাকা তিনি পেয়েছেন এবং বৈলর, রাগামারা, বগারবাজার ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সংলগ্ন চারটি স্থানে দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন।

তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও খামারিদের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। এসব স্থানে দুধ সংগ্রহের নিয়মিত কার্যক্রম চালু হওয়ার কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কোথাও সাইনবোর্ড থাকলেও কেন্দ্রের দরজা ছিল বন্ধ। কোথাও আবার সামান্য কিছু যন্ত্রপাতি রাখার পর সেগুলো আর ব্যবহার করা হয়নি।

প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, খামারিদের কাছাকাছি এলাকায় স্থাপিত ভিলেজ মিল্ক কালেকশন সেন্টারে আধুনিক ল্যাবরেটরিতে দুধের চর্বি ও এসএনএফ পরীক্ষা করার কথা। পরীক্ষার ফল অনুযায়ী খামারিদের ন্যায্যমূল্য দেওয়ার পাশাপাশি একাধিক কেন্দ্র থেকে দুধ সংগ্রহ করে ডেইরি হাবে নিয়ে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণের কথা ছিল। পরে সেই দুধ বড় দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করার পরিকল্পনা ছিল।

এ জন্য সরকার ম্যাচিং গ্রান্টের মাধ্যমে প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৫০ শতাংশ, সর্বোচ্চ দুই কোটি ৬১ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করে। বাকি অর্থ উদ্যোক্তার নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়ার কথা।

ত্রিশালে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৯ সালে। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর চলতি বছরের মার্চে কাগজে-কলমে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে বলে দেখানো হয়। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য—খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ—বাস্তবায়িত হয়নি।

বৈলর ইউনিয়নের মঠবাড়ী দাখিল মাদ্রাসা রোড এলাকায় একটি ঘরে কথিত ল্যাব স্থাপন করা হয়েছিল। ঘরের মালিক আবুল কাশেম জানান, দুধ সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা শরিফুল ইসলাম একটি যন্ত্র এনে ছয়-সাত মাস রেখেছিলেন। কিন্তু কোনো খামারির কাছ থেকে সেখানে দুধ সংগ্রহ করা হয়নি।

স্থানীয় খামারি মিন্টু ও রবিনের ১০ থেকে ১২টি করে দুধেল গাভি রয়েছে। তাঁরা জানান, দুধ বিক্রি করতে গিয়ে তাঁদের প্রায়ই সমস্যায় পড়তে হয়। অথচ এলাকায় সরকারি সহায়তায় আধুনিক দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের কথা তাঁরা জানতেনই না।

রাগামারা বাজারেও একটি দোকানের সামনে প্রকল্পের সাইনবোর্ড ঝোলানো হয়েছিল। দোকানের মালিক রমজান আলী জানান, সাইনবোর্ড থাকলেও সেখানে দুধ সংগ্রহের কোনো কার্যক্রম হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মাঝে মাঝে কর্মকর্তারা গাড়ি নিয়ে এসে কিছুক্ষণ অবস্থান করতেন এবং ছবি তুলে চলে যেতেন।

বাগান গ্রামের খামারি মোনায়েমও প্রকল্পটির বিষয়ে অবগত ছিলেন না। তাঁর বক্তব্য, অনুসন্ধানকারীর কাছ থেকেই তিনি প্রথম জানতে পারেন যে তাঁদের এলাকায় সরকারি সহায়তায় খামারিদের জন্য এমন একটি প্রকল্প চালু হয়েছিল।

আমিরাবাড়ী ইউনিয়নের বগারবাজার এবং উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সংলগ্ন এলাকাতেও দুধ সংগ্রহ কেন্দ্রের কার্যক্রমের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে উদ্যোক্তা আতিকুল্লাহ বাহার বলেন, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী ত্রিশালের খামারিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে তাঁরা প্রতি লিটার দুধ ৬০ টাকার কমে বিক্রি করতে রাজি হননি। পরে লিটারে ১০ টাকা ভর্তুকি দিয়ে দুই মাস কার্যক্রম চালানোর পর ময়মনসিংহের ভালুকা, ফুলপুর ও সিরাজগঞ্জ থেকে দুধ সংগ্রহ করা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

ত্রিশালে কাগজে-কলমে দুধ সংগ্রহ দেখিয়ে ফটোসেশন করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বাহার বলেন, কিছু দুধ ত্রিশাল থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। পরে কার্যক্রম উপজেলার বামনাখালী গ্রামের তাঁর কে সি এগ্রো খামারে চালু রাখা হয়।

তবে ওই খামারেও অনুসন্ধানে দুধ সংগ্রহের কোনো কার্যক্রম পাওয়া যায়নি। শেডগুলো ফাঁকা ছিল এবং কোনো গরু দেখা যায়নি। কথিত ল্যাব কক্ষটিও তালাবদ্ধ ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সেখানে কখনও দুধ সংগ্রহের কার্যক্রম চালু হয়নি। বরং দই তৈরি করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো।

ফুলপুরের শাহপুর বাজারেও কে সি এগ্রো নামে প্রকল্পের কোনো দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র পাওয়া যায়নি। সেখানে ‘নিরাপদ এগ্রো’ নামে একটি আলাদা দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র রয়েছে। একইভাবে ভালুকার প্রশিকার মোড় এলাকায় কে সি এগ্রোর নামে সাইনবোর্ড থাকলেও প্রকল্পের কোনো কার্যক্রম পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের ভাষ্য, সেখানে আগে দই-মিষ্টি তৈরি করা হতো এবং পরে কিছু সময় দুধ-ডিম বিক্রি করা হয়েছে।

প্রকল্পের বিষয়ে ত্রিশাল উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নাজনীন সুলতানা বলেন, প্রকল্পটি তাঁর তত্ত্বাবধানে ছিল না। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার মাধ্যমে এলডিডিপির প্রধান কার্যালয় থেকে কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি নিজেকে স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে প্রকল্পটির বিষয়ে অবগত থাকার কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট উপপ্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ওয়াহেদুল আলম বলেন, প্রকল্পের বিষয়ে জানতে তিনি উদ্যোক্তা বাহারকে একাধিকবার ফোন করেছেন। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। অনুসন্ধানে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তিনিও একই ধরনের তথ্য পেয়েছেন বলে জানান।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকারি অনুদানে নেওয়া প্রকল্প চালু রাখা না হলে উদ্যোক্তাকে এত টাকা কেন দেওয়া হলো। প্রয়োজন হলে তদন্তের মাধ্যমে সরকারের দেওয়া অর্থ ফেরত নেওয়ার কথাও বলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা একটি টিম ঢাকা থেকে এসে কয়েকবার প্রকল্প পরিদর্শন করেছে বলেও তাঁকে জানানো হয়েছিল।

এ বিষয়ে ত্রিশালের দায়িত্বে থাকা এলডিডিপির উপপ্রকল্প পরিচালক হিরণ্ময় বিশ্বাসের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রান্তিক খামারিদের দুধ ন্যায্যমূল্যে বিক্রির সুযোগ তৈরি এবং দুধ সংরক্ষণের অবকাঠামো গড়ে তোলাই ছিল প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম না থাকলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি প্রকল্পের মূল সুবিধাভোগী খামারিরাও বঞ্চিত হন। ফলে দুই কোটি ৬১ লাখ টাকার এই সরকারি সহায়তা কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত