কারাগারে ইমরানকে নির্যাতনের অভিযোগ বোনের

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার
কারাগারে ইমরানকে নির্যাতনের অভিযোগ বোনের

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান কারাগারে দীর্ঘদিন ধরে একাকী বন্দিত্ব ও গুরুতর অন্যায় আচরণের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন তার বোন উজমা খান। হাসপাতালে ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ইমরানের বন্দিজীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কারা কর্তৃপক্ষ বা সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

উজমার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ মাস পর তিনি ইমরান খানের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছেন। তার দাবি, সাক্ষাতের সময় ইমরান তাকে জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে তার সঙ্গে অত্যন্ত অন্যায় আচরণ করা হচ্ছে। এ বিষয়টি সবার কাছে তুলে ধরতেও তিনি বোনকে অনুরোধ করেছেন বলে জানান উজমা। তার বক্তব্যে ইমরানের দীর্ঘ কারাবাস, একাকীত্ব এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ইসলামাবাদের কে-পি হাউসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উজমা তার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে ডেকে পাঠানো হয়। সেখানে যাওয়ার পর প্রথমে তাকে পুলিশের একজন উপপরিদর্শকের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। পরে একটি ছোট গাড়িতে করে তাকে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস বা পিআইএমএসে নেওয়া হয়।

হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কিছু সময় অপেক্ষা শেষে তিনি ইমরানকে দেখতে পান। উজমার বর্ণনা অনুযায়ী, ইমরান সেখানে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের দেখিয়ে তাকে জানান, দীর্ঘ প্রায় ১০ মাস পর তার বোন তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। এই সাক্ষাৎকে উজমা তার ভাইয়ের বন্দিজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন।

সাক্ষাতের সময় প্রশাসনিক জটিলতা ও অপেক্ষা নিয়েও অভিযোগ করেন উজমা। তার দাবি, তাকে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যদের বারবার বিভিন্ন জায়গায় বসিয়ে রাখা হচ্ছিল। কর্মকর্তারা নানা কারণ দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করছিলেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এমন পরিস্থিতিতে ইমরানের সঙ্গে সাক্ষাৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল বলে জানান তিনি।

হাসপাতালে ইমরানের চিকিৎসা নিয়েও বিস্তারিত তথ্য দেন উজমা। তার দাবি, চিকিৎসাকর্মীরা ইমরানের চোখের চিকিৎসা এবং ব্যবহৃত ড্রপ সম্পর্কে জানতে চান। পরে তার একটি চোখে চিকিৎসা করা হয় এবং সেখানে ইনজেকশন দেওয়া হয়। অন্য চোখটি ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। চিকিৎসা কার্যক্রমের পাশাপাশি ইমরানের রক্তচাপও পরীক্ষা করা হয় বলে জানান তিনি।

উজমা বলেন, পরীক্ষার সময় ইমরানের রক্তচাপ ছিল ১২০/৮০। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শারীরিকভাবে ইমরানকে সে সময় মোটামুটি সুস্থই মনে হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে তিনি কারাগারে নির্যাতন ও একাকী বন্দিত্বের অভিযোগ তুলেছেন, অন্যদিকে সাক্ষাতের সময় ভাইয়ের শারীরিক অবস্থা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো সংকটের কথা জানাননি।

হাসপাতালে নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন উজমা। তার অভিযোগ, তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা শুরুতে স্পষ্ট করে জানানো হয়নি। তিনি একাধিকবার গন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো পরিষ্কার উত্তর দেননি বলে দাবি করেন। এমনকি তাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও জানতে চেয়েছিলেন তিনি। পরে একজন চিকিৎসকের সঙ্গে তার পরিচয় হয় বলে জানান উজমা।

উজমার বক্তব্যে ইমরানের দীর্ঘ একাকীত্বের বিষয়টিও বিশেষভাবে উঠে আসে। তিনি জানান, তার ভাই বর্তমান বন্দিত্বের সঙ্গে মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির কারাবন্দিত্বের তুলনা করেছেন। ইমরানের ভাষ্য অনুযায়ী, মুরসিকেও দীর্ঘ সময় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে তার মৃত্যু হয়। এ তুলনার মাধ্যমে নিজের দীর্ঘ একাকী বন্দিত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইমরান—এমনটাই জানিয়েছেন তার বোন।

ইমরানের চিকিৎসা নিয়ে আরও একটি উদ্বেগের কথা জানান উজমা। তার দাবি, একজন চিকিৎসক ইমরানকে বলেছেন, দীর্ঘ সময় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকার কারণে তার রক্তচাপ বেড়ে যাচ্ছে। বন্দিত্বের মানসিক ও শারীরিক প্রভাব নিয়ে ইমরানের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য এসেছে বলে জানান তিনি। তবে চিকিৎসকের পরিচয় বা এ বিষয়ে স্বাধীন কোনো চিকিৎসা প্রতিবেদন তিনি প্রকাশ্যে তুলে ধরেননি।

ফজরের আজানের সময়ের দিকে ইমরানের সঙ্গে উজমার সাক্ষাৎ শেষ হয় বলে জানা গেছে। এরপর তাকে আবার আদিয়ালা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছু সময় পর ইমরানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. ফয়সাল সুলতানও কারাগারে পৌঁছান। এর আগে ইমরানকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছিল।

ইমরানের চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদিও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। এ কারণে পিটিআই আদালত অবমাননার আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

এর আগে শুক্রবার দিনের শুরুতে ইমরান খানকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে প্রয়োজনীয় কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা শেষে তাকে আবার আদিয়ালা কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তাকে হাসপাতালে নেওয়া ও কারাগারে ফেরত পাঠানো হয় বলে স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ইমরান খান ২০২৩ সাল থেকে কারাগারে রয়েছেন। তোশাখানা মামলায় তাকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তার দীর্ঘ কারাবাস পাকিস্তানের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। ইমরানের দল পিটিআই নিয়মিতভাবে তার মুক্তি, উন্নত চিকিৎসা এবং কারাগারে তার সঙ্গে আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা ও সাজা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চলছে।

সম্প্রতি ইমরানের কারাগারসংক্রান্ত চিকিৎসা নথিতে রক্তচাপ ওঠানামা এবং সংশ্লিষ্ট কিছু শারীরিক সমস্যার বিষয় উঠে আসার পর তার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে হাসপাতালে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসা পরীক্ষার পর তাকে আবার কারাগারে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ইমরানের বোনের সাম্প্রতিক অভিযোগ নতুন করে তার বন্দিজীবনের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মনোযোগের বিষয় করে তুলতে পারে। তবে নির্যাতনের অভিযোগটি উজমার বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে এবং এর স্বাধীন যাচাই বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত পাল্টা বক্তব্য ছাড়া অভিযোগটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। একইভাবে চিকিৎসা পরিস্থিতি নিয়েও উজমার দেওয়া তথ্যের পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক চিকিৎসা প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ইমরানের দীর্ঘ কারাবাসের মধ্যে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ, চিকিৎসা সুবিধা এবং বন্দিত্বের পরিবেশ নিয়ে বিতর্ক পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন নয়। সর্বশেষ সাক্ষাতের পর তার বোনের বক্তব্য সেই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কারাবন্দিত্বের ক্ষেত্রে মানবিক অধিকার, পর্যাপ্ত চিকিৎসা এবং আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না—এ প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

ইমরান খান বর্তমানে কারাগারে থাকলেও পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে তার প্রভাব এখনও উল্লেখযোগ্য। ফলে তার স্বাস্থ্য ও বন্দিত্বের পরিস্থিতি নিয়ে যেকোনো নতুন তথ্য দ্রুত রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। উজমার অভিযোগের পরও এখন নজর থাকবে পাকিস্তানের কারা কর্তৃপক্ষ, সরকার, আদালত এবং চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের পরবর্তী বক্তব্যের দিকে। তার স্বাস্থ্য ও বন্দিত্বের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে এলে বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত