ন্যান্সি কিসিঞ্জার আর নেই

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার
ন্যান্সি কিসিঞ্জার আর নেই

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি এ কিসিঞ্জারের স্ত্রী ন্যান্সি কিসিঞ্জার মারা গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যের সাউথ কেন্টে নিজ বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক কূটনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ের সঙ্গে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন ন্যান্সি কিসিঞ্জার। স্বামী হেনরি কিসিঞ্জারের সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় তিনি বিভিন্ন কূটনৈতিক সফরে তাঁর সঙ্গে ছিলেন। পরবর্তী সময়েও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে কিসিঞ্জার দম্পতির উপস্থিতি ছিল বেশ পরিচিত।

হেনরি কিসিঞ্জার ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর ১০০ বছর বয়সে মারা যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন হিসেবে বিবেচিত হেনরি কিসিঞ্জারের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা অধ্যায়ের নীরব সঙ্গী ছিলেন ন্যান্সি। স্বামীর সরকারি দায়িত্বের সময় থেকে শুরু করে অবসরজীবন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ দশকের দাম্পত্যে দুজনকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও সামাজিক আয়োজনে একসঙ্গে দেখা গেছে।

১৯৭৪ সালে হেনরি কিসিঞ্জারের সঙ্গে ন্যান্সির বিয়ে হয়। সে সময় হেনরি কিসিঞ্জার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। বিয়ের পর ন্যান্সি তাঁর স্বামীর সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক সফরে অংশ নেন। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, বিদেশি নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আয়োজনেও তাঁকে কিসিঞ্জারের পাশে দেখা যেত।

১৯৭৭ সালে হেনরি কিসিঞ্জার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়ার পরও কিসিঞ্জার দম্পতি ওয়াশিংটনের পরিচিত সামাজিক ও রাজনৈতিক মুখ হিসেবে থেকে যান। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ, দূতাবাসের অনুষ্ঠান এবং রাজনৈতিক আয়োজনে তাঁদের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। নিউইয়র্ক শহরেও তাঁরা ছিলেন পরিচিত দম্পতি। সেখানে জাদুঘরের উদ্বোধন, ফ্যাশন অনুষ্ঠান এবং দাতব্য তহবিল সংগ্রহের বিভিন্ন আয়োজনে তাঁদের অংশ নিতে দেখা যেত।

ন্যান্সি কিসিঞ্জারকে ঘনিষ্ঠজনেরা বুদ্ধিমতী, দক্ষ, আন্তরিক এবং রসবোধসম্পন্ন একজন নারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজের অবস্থান ও মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রেও দৃঢ় ছিলেন। হেনরি কিসিঞ্জারের রাজনৈতিক জীবন যেমন তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে, তেমনি তাঁর স্ত্রী হিসেবে ন্যান্সিও দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজাত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলের অংশ ছিলেন।

তবে ন্যান্সির জীবন কেবল সামাজিক অনুষ্ঠান আর কূটনৈতিক সফরে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর স্বামীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং পররাষ্ট্রনীতির নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যেমন প্রশংসা ছিল, তেমনি ছিল তীব্র বিতর্ক। ফলে হেনরি কিসিঞ্জারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে ঘিরে বিতর্কের প্রভাব ন্যান্সির ব্যক্তিজীবনেও পড়েছিল।

হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও জেরাল্ড ফোর্ডের প্রশাসনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর সময়েই যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত সম্পর্কের উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা এবং মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পায়।

চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় তৈরিতেও কিসিঞ্জারের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে চীনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনেও তিনি একাধিক কূটনৈতিক উদ্যোগ পরিচালনা করেন।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের অবসান ঘটাতে প্যারিস শান্তি আলোচনাতেও হেনরি কিসিঞ্জার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ওই আলোচনার মাধ্যমে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের অবসানের পথ তৈরি হয়। এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য কিসিঞ্জার ভিয়েতনামের কূটনীতিক লে দুক তো’র সঙ্গে যৌথভাবে ১৯৭৩ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।

স্বামীর এমন গুরুত্বপূর্ণ ও একই সঙ্গে বিতর্কিত রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ সময় ন্যান্সি কিসিঞ্জার খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। সরকারি দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও হেনরি কিসিঞ্জার আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে ন্যান্সির উপস্থিতি অব্যাহত ছিল।

কিসিঞ্জার দম্পতির নিউইয়র্কের জীবনও ছিল বেশ ব্যস্ত। শহরের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁদের দেখা যেত। তবে ১৯৮০-এর দশকের শুরু থেকে তাঁরা ধীরে ধীরে সামাজিক ব্যস্ততা কমিয়ে দেন। অবসরজীবনের বড় একটি অংশ তাঁরা কানেটিকাটের সাউথ কেন্টে নিজেদের বাড়িতে কাটাতে শুরু করেন। প্রায় ৩০০ একর জায়গাজুড়ে থাকা ওই বাড়ি তাঁদের গ্রীষ্মকাল ও সাপ্তাহিক ছুটির অন্যতম প্রধান আশ্রয় ছিল।

দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে ন্যান্সি কিসিঞ্জার ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জারের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ব্যস্ত সময়, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, কূটনৈতিক সফর এবং পরবর্তী অবসরজীবন—সব পর্যায়েই তাঁদের একসঙ্গে দেখা গেছে। ফলে হেনরি কিসিঞ্জারের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে ন্যান্সির ব্যক্তিগত ইতিহাসও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

হেনরি কিসিঞ্জারের মৃত্যুর প্রায় তিন বছর পর ন্যান্সির মৃত্যুতে কিসিঞ্জার দম্পতির দীর্ঘ জীবনেরও পরিসমাপ্তি ঘটল। আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে হেনরি কিসিঞ্জারের নাম বহুল আলোচিত হলেও তাঁর দীর্ঘ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত অধ্যায়ের অংশ ছিলেন ন্যান্সি। স্বামীর পাশে থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের এক দীর্ঘ সময় প্রত্যক্ষ করেছেন।

ন্যান্সি কিসিঞ্জারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত একটি পরিচিত মুখেরও বিদায় হলো। তাঁর জীবনের বড় অংশ কেটেছে এমন এক সময়ে, যখন হেনরি কিসিঞ্জার যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ছিলেন। সেই দীর্ঘ পথচলায় ন্যান্সির উপস্থিতি ছিল নীরব, কিন্তু দৃশ্যমান।

পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর জানানো হলেও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ৯২ বছর বয়সে সাউথ কেন্টের নিজ বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়। দীর্ঘ জীবনের শেষ সময়টুকুও তিনি সেই পরিবেশেই কাটিয়েছেন, যেখানে কিসিঞ্জার দম্পতি বহু বছর ধরে ব্যক্তিগত জীবনের ব্যস্ততা থেকে দূরে সময় কাটাতেন।

ন্যান্সি কিসিঞ্জারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শুধু একজন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জীবনসঙ্গীর বিদায় ঘটল না, শেষ হলো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইতিহাসের একটি পরিচিত দম্পতির দীর্ঘ যৌথ অধ্যায়ও।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত