গোপনীয়তা মামলায় হার, হ্যারিদের ৫৭৫ কোটি টাকার ঝুঁকি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ বার
গোপনীয়তা মামলায় হার, হ্যারিদের ৫৭৫ কোটি টাকার ঝুঁকি

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ডেইলি মেইলের বিরুদ্ধে গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও বেআইনিভাবে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগে করা মামলায় হেরে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছেন প্রিন্স হ্যারি, সংগীতশিল্পী এলটন জনসহ সাত বিশিষ্ট ব্যক্তি। যুক্তরাজ্যের হাইকোর্টের সাম্প্রতিক আদেশ অনুযায়ী, মামলায় প্রতিপক্ষের আইনি খরচ বাবদ তাঁদের সর্বোচ্চ ৩ কোটি ৪৫ লাখ পাউন্ড পর্যন্ত অর্থ পরিশোধ করতে হতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ পাউন্ড ১৬৬ টাকা ধরে এই অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৭৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

মামলাটির আর্থিক পরিণতি এরই মধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। আদালত প্রাথমিকভাবে সাত বাদীকে ডেইলি মেইলের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্স লিমিটেডকে ৯৫ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১৫৮ কোটি টাকা। আগামী শুক্রবারের মধ্যে এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। তবে এটিই চূড়ান্ত অর্থ নয়। মামলার প্রকৃত আইনি ব্যয় নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ হলে তাঁদের ওপর আরও বড় অঙ্কের দায় পড়তে পারে।

এই মামলায় প্রিন্স হ্যারির সঙ্গে বাদী হিসেবে ছিলেন গায়ক এলটন জন ও তাঁর স্বামী ডেভিড ফার্নিশ, অভিনেত্রী লিজ হার্লি, অভিনেত্রী স্যাডি ফ্রস্ট, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সাবেক উপনেতা সাইমন হিউজেস এবং অধিকারকর্মী ব্যারনেস লরেন্স। তাঁরা অভিযোগ করেছিলেন, ডেইলি মেইল ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকাশনাগুলো তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বেআইনি পদ্ধতি ব্যবহার করেছে।

অভিযোগগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি এবং বিভিন্ন অননুমোদিত পদ্ধতিতে তথ্য পাওয়ার মতো গুরুতর বিষয় ছিল। বাদীদের দাবি ছিল, দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে সংবাদমাধ্যমের অনধিকার প্রবেশ ঘটেছে এবং সেই প্রক্রিয়ায় তাঁদের গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। অন্যদিকে অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্স লিমিটেড শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল।

দীর্ঘ শুনানি ও প্রমাণ পর্যালোচনার পর গত ৭ জুলাই বিচারপতি নিকলিন বাদীদের মূল দাবিগুলো খারিজ করে দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে—এটিই প্রমাণ করে না যে সেটি বেআইনি উপায়ে সংগ্রহ করা হয়েছিল। বেআইনি তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হলে তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। কেবল সন্দেহ, অনুমান বা পরিস্থিতিগত ধারণার ওপর ভিত্তি করে এমন গুরুতর অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

এই রায়ের পর মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে আইনি ব্যয়। অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্স জানিয়েছে, মামলাটি লড়তে তাদের মোট আইনি ব্যয় প্রায় ৩ কোটি ৪৫ লাখ পাউন্ডে পৌঁছেছে। বিপরীতে বাদীদের আইনি খরচের জন্য যে বিমা ছিল, তার সীমা প্রায় ১ কোটি ৬২ লাখ পাউন্ড। ফলে বিমার আওতায় থাকা অর্থের বাইরে আরও প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ডের ব্যয় তাঁদের নিজেদের বহন করতে হতে পারে।

বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অতিরিক্ত অর্থও কয়েকশ কোটি টাকার সমান। ফলে মামলায় হারের পর শুধু আইনি পরাজয় নয়, আর্থিকভাবেও বড় ধরনের চাপে পড়েছেন প্রিন্স হ্যারি ও তাঁর সহবাদীরা। তবে আদালতের চূড়ান্ত হিসাব নির্ধারণের আগে পুরো ৩ কোটি ৪৫ লাখ পাউন্ড তাঁদের পরিশোধ করতে হবে—এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই। প্রকৃতপক্ষে কত অর্থ আদায় করা যাবে, তা পরবর্তী আইনি ব্যয় নির্ধারণ প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।

বিচারপতি নিকলিন মামলায় বাদীদের পক্ষের আইনি ব্যয় ও দাবি উপস্থাপনের পদ্ধতি নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, মামলার কিছু অভিযোগ এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যা অত্যন্ত মাত্রায় অযৌক্তিক ছিল। গুরুতর অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও সেগুলো মামলার অংশ হিসেবে সামনে রাখার বিষয়টিকে আদালত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে।

তবে অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্স যে ৩ কোটি ৪৫ লাখ পাউন্ড আইনি ব্যয় দাবি করছে, তার পুরোটাই যুক্তিসংগত কি না, সেটি নিয়েও বিচারপতি প্রশ্ন তুলেছেন। এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রতিটি অংশ যথাযথ ও প্রয়োজনীয় ছিল কি না, তা পরবর্তী পর্যায়ে মূল্যায়ন করা হবে। একই সঙ্গে তিনি এখনই আইনি ব্যয়ের ওপর একটি নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দিতে রাজি হননি। তাঁর মতে, আগেভাগে একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করলে সেটি অতিরিক্ত সাধারণীকরণ হতে পারে এবং ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে।

মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আপিলের সম্ভাবনা। প্রিন্স হ্যারি ও অন্য বাদীদের আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য আগামী ২ অক্টোবর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। ফলে বর্তমান রায়ই এই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত অধ্যায় কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাঁরা আপিলের সিদ্ধান্ত নিলে মামলাটি আরও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার দিকে যেতে পারে।

প্রিন্স হ্যারির জন্য এই মামলার পরিণতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তাঁর আইনি বিরোধ নতুন নয়। ব্যক্তিগত জীবন, সংবাদমাধ্যমের নজরদারি এবং রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে তাঁর পরিবারের ওপর সংবাদমাধ্যমের আচরণ নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সরব। অতীতে তিনি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে করা মামলায় সাফল্যও পেয়েছেন। ফলে ডেইলি মেইলের বিরুদ্ধে এই মামলায় পরাজয় তাঁর দীর্ঘদিনের সংবাদমাধ্যমবিরোধী আইনি লড়াইয়ে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মামলার শুনানির সময় ব্যক্তিগত জীবনে সংবাদমাধ্যমের হস্তক্ষেপের বিষয়টি নিয়ে আবেগঘন বক্তব্যও দিয়েছিলেন প্রিন্স হ্যারি। তাঁর অভিযোগ ছিল, সংবাদমাধ্যমের আচরণ তাঁর স্ত্রী মেগানসহ পরিবারের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করেছে। তিনি সংবাদমাধ্যমের কর্মকাণ্ডকে নিজের পরিবারের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর বলে বর্ণনা করেছিলেন।

অন্যদিকে মামলায় জয়ের পর অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্সের পক্ষ থেকে এটিকে তাদের সাংবাদিকতা ও সংবাদ প্রকাশের পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান হলো, বাদীরা যেসব গুরুতর অভিযোগ তুলেছিলেন, সেগুলোর পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। আদালতের রায়ও শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থানের পক্ষে গেছে।

এই রায়ের ফলে যুক্তরাজ্যে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং বেআইনি তথ্য সংগ্রহের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একদিকে ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনের সুরক্ষা ও গোপনীয়তার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকারও গণতান্ত্রিক সমাজে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। আদালতের এই মামলায় সেই দুই অধিকারের মধ্যকার ভারসাম্যের প্রশ্নও সামনে এসেছে।

এখন সবার নজর চূড়ান্ত আইনি ব্যয়ের দিকে। প্রাথমিকভাবে ৯৫ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড পরিশোধের নির্দেশ ইতোমধ্যে বড় আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। চূড়ান্ত হিসাব যদি অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপার্সের দাবির কাছাকাছি যায়, তাহলে প্রিন্স হ্যারি ও তাঁর সহবাদীদের জন্য এই মামলা হয়ে উঠতে পারে কয়েকশ কোটি টাকার এক ব্যয়বহুল আইনি লড়াই। আর তাঁরা যদি আপিল করেন, তাহলে এই বিরোধের আইনি অধ্যায় আরও দীর্ঘ হওয়ার সম্ভাবনাই এখন বেশি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত